এই থেরাপির মূল লক্ষ্য শুধু কথা বলা শেখানো নয়; বরং ব্যক্তির প্রয়োজন বোঝা, নিজের ভাবনা ও চাহিদা প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানো। ব্যক্তির প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী কথ্য ভাষার পাশাপাশি ইশারা, ছবি, কমিউনিকেশন বোর্ড কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যবহার করা হয়।
একজন স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট ব্যক্তির যোগাযোগের দক্ষতা, সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজন মূল্যায়ন করে উপযোগী চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন। এ ক্ষেত্রে বয়স, ভাষা বিকাশের পর্যায়, ব্যক্তিগত পছন্দ, পারিবারিক পরিবেশ এবং দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো শিশু পানি চাইতে না পেরে কান্নাকাটি করলে থেরাপির লক্ষ্য শুধু তাকে ‘পানি’ শব্দটি উচ্চারণ করানো নয়। বরং সে যেন কথা, ইশারা, ছবি বা অন্য কোনো উপযুক্ত মাধ্যমে নিজের চাহিদা জানাতে পারে, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। পরে তার সক্ষমতা অনুযায়ী শব্দ ও বাক্য ব্যবহার এবং কথোপকথনের দক্ষতা বিকাশে কাজ করা হয়।
মূল্যায়ন ছাড়া থেরাপি নয়
অটিজমে আক্রান্ত প্রত্যেক ব্যক্তির যোগাযোগের ধরন ও প্রয়োজন এক নয়। তাই সবার জন্য একই ধরনের থেরাপি বা অনুশীলন কার্যকর হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। থেরাপি শুরুর আগে ব্যক্তির প্রয়োজনভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি।
এ মূল্যায়নে সাধারণত কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা হয়—
ভাষা বোঝার দক্ষতা: নির্দেশনা, প্রশ্ন, শব্দ ও বাক্যের অর্থ কতটা বুঝতে পারেন।
ভাষা প্রকাশের দক্ষতা: কথা, অঙ্গভঙ্গি, ছবি কিংবা অন্য মাধ্যমে নিজের বক্তব্য কীভাবে প্রকাশ করেন।
সামাজিক যোগাযোগ: কথোপকথন, যৌথ কার্যক্রম ও পারস্পরিক যোগাযোগে অংশগ্রহণের সক্ষমতা।
কথ্য ভাষার বৈশিষ্ট্য: শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার, উচ্চারণ, কণ্ঠস্বরের সুর এবং একই কথা বারবার বলার ধরন ও ভূমিকা।
বিকল্প যোগাযোগের প্রয়োজন: ছবি, কমিউনিকেশন বোর্ড বা প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা প্রয়োজন কি না।
দৈনন্দিন কার্যকারিতা: বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক পরিবেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কী ধরনের সহায়তা দরকার।
মূল্যায়নের ভিত্তিতে থেরাপির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। যেমন—শিশু যেন নিজের পছন্দ জানাতে পারে, প্রয়োজন হলে সাহায্য চাইতে পারে অথবা কোনো কাজে অংশ নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করতে পারে। এসব লক্ষ্য হতে হয় নির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত ও পর্যবেক্ষণযোগ্য। সময়ের সঙ্গে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে থেরাপির কৌশল ও লক্ষ্য পরিবর্তন করা হয়।
শ্রবণক্ষমতা যাচাইও জরুরি
শিশুর ভাষা বিকাশে বিলম্ব বা যোগাযোগের সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রবণক্ষমতা পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শ্রবণসমস্যা ভাষা ও যোগাযোগের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ক্ষেত্রে অডিওলজিস্টের মাধ্যমে শ্রবণ পরীক্ষা করানো যেতে পারে।
অটিজম শনাক্তকরণ এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য অবস্থার মূল্যায়ন সংশ্লিষ্ট যোগ্য ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাজীবীদের মাধ্যমে করানো প্রয়োজন। স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা নিজ নিজ পেশাগত দায়িত্ব অনুযায়ী মূল্যায়ন ও সহায়তা দিয়ে থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, অভিভাবকদের উচিত শিশুর যোগাযোগ বা ভাষা বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিলে দেরি না করে যোগ্য ও নিবন্ধিত পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া। ব্যক্তির সক্ষমতা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিত থেরাপি এবং পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ যোগাযোগের দক্ষতা ও দৈনন্দিন জীবনে অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স