দেশে বন উজাড় ও বৃক্ষনিধন রোধে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত বন ও বৃক্ষনিধন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদ ও গবেষকরা। তাদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প, নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামো নির্মাণের চাপের কারণে দেশের বনভূমি ও বৃক্ষআচ্ছাদন উদ্বেগজনক হারে কমে যাচ্ছে, যা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার পরিবেশ অধিদপ্তরের মিলনায়তনে আয়োজিত ‘গাছনিধন মিডিয়া মনিটরিং ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি), গ্রীন ভয়েস, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন, ব্রাইটার্স এবং ন্যাশনাল ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে আরডিআরসির কোষাধ্যক্ষ আমিনুর রসুল বাবুল জানান, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ৫২ হাজার ৩৭৫টি বৃক্ষনিধনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এ সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৭১ দশমিক ২ শতাংশ কম। প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ২৩ হাজার ৪১টি এবং কক্সবাজারে প্রায় ১১ হাজার বৃক্ষনিধনের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
তিনি বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণে ৯ দফা সুপারিশ তুলে ধরে বলেন, বিদ্যমান বন আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় বন ও বৃক্ষনিধন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, টেকসই কৃষি ও কৃষিবনায়ন সম্প্রসারণ, নগর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামো অন্তর্ভুক্তি, পরিবেশ শিক্ষা জোরদার এবং স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, বৃক্ষনিধন ও বন উজাড়ের কারণে মাটিক্ষয়, ভূমিধস, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে। বনভূমি কমে যাওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতাও দুর্বল হচ্ছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বৃক্ষনিধনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তিনি জানান, সরকার বর্তমানে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের একটি বৃহৎ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বৃক্ষনিধন আরও কমানো সম্ভব হবে। পরিবেশগত অপরাধ প্রতিরোধে ইউনিয়ন পর্যায়ে নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিবেশবিদ মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পরিবেশ আদালত আইনসহ সংশ্লিষ্ট সব আইন কার্যকর প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ, জলবায়ু ও নদী রক্ষায় কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, গবেষক, সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মীরা অংশ নেন। বক্তারা বন উজাড় ও বৃক্ষনিধন রোধে সরকার, নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেন।

শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ