উপমহাদেশের ইসলামী জ্ঞানচর্চার অন্যতম বিশিষ্ট আলেম, গবেষক, লেখক ও চিন্তাবিদ মাওলানা সাইয়েদ সালমান হোসাইনি নদভীর মৃত্যুতে মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানাঙ্গনে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে। গত ২৯ জুন তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি ইসলামী শিক্ষা, গবেষণা, সমাজসংস্কার ও যুবসমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।
১৯৫৪ সালে ভারতের লখনৌর একটি ঐতিহ্যবাহী আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সালমান নদভী। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী হাসানি নদভীর দৌহিত্র। শৈশব থেকেই ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশে বেড়ে ওঠা তিনি দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা থেকে হিফজ সম্পন্ন করেন। পরে একই প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক ও হাদিস শাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে হাদিস গবেষণায় বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেন।
জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি সমাজগঠনেও ছিল তার সক্রিয় ভূমিকা। ছাত্রজীবনেই তিনি সহপাঠীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জামিয়াত শাবাব আল-ইসলাম’, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরিচিত ইসলামী যুবসংগঠনে পরিণত হয়। এছাড়া শিক্ষা ও মানবকল্যাণে মেডিক্যাল কলেজ, হাসপাতাল এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষা ও ইসলামী মূল্যবোধের সমন্বয়ে কাজ করেন।
আরবি ও উর্দু ভাষার শক্তিশালী বক্তা হিসেবে সালমান নদভী আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আখেরি ওহি’, ‘মিশআলুল মাসাবিহ’, ‘মাশায়েখুল ইমাম বুখারি’ এবং আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থমালা ‘মুযাক্কিরাতি’। ইসলামী চিন্তা ও গবেষণায় এসব রচনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বাংলাদেশের সঙ্গেও ছিল তার গভীর সম্পর্ক। বিভিন্ন সময়ে আল্লামা সুলতান যওক নদভী ও বায়তুশ শরফের পীর মাওলানা আবদুল হাই নদভীর আমন্ত্রণে তিনি বাংলাদেশ সফর করেন। এসব সফরে তিনি তরুণ প্রজন্মের জন্য আধুনিক শিক্ষা, ইসলামী জ্ঞান ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তবে জীবনের শেষ পর্যায়ে তার কিছু বক্তব্য ও মতামত আলেমসমাজের একাংশের মধ্যে বিতর্কের জন্ম দেয়। খেলাফত, মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্য, সাহাবায়ে কেরামের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বাবরি মসজিদ ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার অবস্থান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। সমালোচকদের মতে, তার কিছু মত প্রচলিত ধারার বাইরে ছিল; অন্যদিকে অনুসারীরা এসবকে স্বাধীন চিন্তা ও গবেষণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
জীবনের শেষ সময়ে তিনি প্রকাশ্যে আত্মসমালোচনা করেন এবং বলেন, ‘আমার কোনো বক্তব্য যদি কুরআন ও সহিহ হাদিসের পরিপন্থী হয়, তবে তা গ্রহণ করা উচিত নয়।’ তার এই বক্তব্যকে অনেকেই সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা ও বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন।
সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন এক শোকবার্তায় বলেন, সময়ের সঙ্গে নিজেকে মূল্যায়ন ও সংশোধনের বিরল মানসিকতা ছিল সালমান নদভীর। তার মৃত্যু ইসলামী জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি এমন এক সময়ে বিদায় নিলেন, যখন মুসলিম বিশ্ব নানা সংকট ও নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
জ্ঞান, গবেষণা, দাওয়াহ, শিক্ষা বিস্তার এবং সমাজসংস্কারে রেখে যাওয়া তার কর্ম ও চিন্তার উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘদিন অনুপ্রাণিত করবে—এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন তার শুভানুধ্যায়ীরা।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক