চরফ্যাশনে কৃষকের সারসংকট, সরকারি সার পাচারের অভিযোগ মিয়ানমারে

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৩ রাত
  • ২০৫৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
ডিলারদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ; দুই অভিযানে ৭৮৫ বস্তা সার জব্দ, আটক ১২

ভোলার চরফ্যাশনে খুচরা বাজারে সারের তীব্র সংকটের মধ্যে সরকারি সার মিয়ানমারে পাচার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অসাধু ডিলার ও চোরাকারবারিদের যোগসাজশে নৌপথে এসব সার পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। মাঝেমধ্যে কোস্টগার্ড ও পুলিশের অভিযানে সারের চালান জব্দ হলেও পাচার পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। এতে চড়া দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চরফ্যাশন পৌরসভাসহ ২২টি ইউনিয়নে ২২ জন নিবন্ধিত সার ডিলার রয়েছেন। সরকারি ডেলিভারি অর্ডারের (ডিও) মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রত্যেক ডিলারের নামে ২২ টন করে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকার নির্ধারিত মূল্যে এসব সার কৃষকদের কাছে বিক্রির নিয়ম রয়েছে।

তবে স্থানীয় ডিলারদের কয়েকজনের দাবি, মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়নগুলোতে কৃষকের সংখ্যা ও চাষযোগ্য জমির পরিমাণ তুলনামূলক কম। অথচ সেখানকার ডিলাররাও অন্য ইউনিয়নের মতো সমপরিমাণ সার বরাদ্দ পাচ্ছেন। ফলে স্থানীয় চাহিদার তুলনায় বেশি বরাদ্দ পাওয়া সার একটি অংশ অবিক্রীত থেকে যায়। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ডিলার উদ্বৃত্ত সার চোরাকারবারিদের কাছে বিক্রি করছেন।

স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী ও কৃষকদের অভিযোগ, প্রথমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করা হয়। পরে উদ্বৃত্ত সার গোপনে চোরাকারবারিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। চোরাকারবারিরা গভীর রাতে ট্রলারে করে নদী ও সমুদ্রপথে এসব সার মিয়ানমারে পাচার করছে।

কৃষকদের ভাষ্য, উদ্বৃত্ত সার স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হলে অন্তত অন্য এলাকার কৃষকেরা উপকৃত হতেন। কিন্তু পাচারের কারণে বাজারে সংকট বাড়ছে এবং বেশি দাম দিয়েও সার পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে সার পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিচ্ছিন্ন চর কুকরিমুকরি ইউনিয়নের সার ডিলার ও মেসার্স জাকির ট্রেডার্সের মালিক মো. জাকির হোসেন। তাঁর দাবি, ডিলারশিপের আওতায় নিয়ম মেনেই কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করা হচ্ছে। কালোবাজারি বা অবৈধভাবে সার বিক্রির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

অভিযানে শত শত বস্তা সার জব্দ

সর্বশেষ গত বুধবার রাতে চরফ্যাশনের দক্ষিণ আইচা থানাধীন তেঁতুলিয়া নদী থেকে ৪৯২ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্টগার্ড। চরমনিকা দক্ষিণ জোনের সদস্যরা এ অভিযান চালিয়ে আটজনকে আটক করেন। আটক ব্যক্তিরা হলেন নোয়াখালীর আজগর হোসেন ও সেলিম মিয়া, লক্ষ্মীপুরের কবির হোসেন, ভোলার আব্দুল মমিন, চরফ্যাশনের মো. শামীম ও মো. ইউসুফ, দুলারহাটের মো. সিরাজ এবং দৌলতখানের মো. রায়হান।

গত বৃহস্পতিবার রাতে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

এর আগে গত ১২ আগস্ট উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বেতুয়া নতুন ফিশারি ঘাট এলাকা থেকে ২৯৩ বস্তা সার জব্দ করে পুলিশ। এ সময় সার পরিবহণে ব্যবহৃত একটি ট্রাক ও একটি বড় ফিশিং বোট আটক করা হয়। ঘটনায় নোয়াখালীর সিরাজ, সোহেল ও শাহারাজ এবং চরফ্যাশনের পারভেজকে আটক করা হয়েছিল। পরে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।

বেতুয়া এলাকার এক মাঝি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সংঘবদ্ধ একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ নৌপথ ব্যবহার করে সারসহ বিভিন্ন পণ্য মিয়ানমারে পাচার করছে। ফেরার সময় ট্রলারে করে ইয়াবাসহ মাদকের চালান আনার অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া গত ২৩ আগস্ট বিকেলে চর কচ্ছপিয়া ঘাটে ১৭৫ বস্তা সারসহ একটি ট্রলার আটক করে কোস্টগার্ড। জব্দ করা সারের মধ্যে ছিল ১০০ বস্তা ইউরিয়া, ৪০ বস্তা ডিএপি, ১৫ বস্তা টিএসপি ও ২০ বস্তা এমওপি।

তবে উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হোসেনের উপস্থিতিতে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর নেওয়ার পর ট্রলার ও সার ছেড়ে দেওয়া হয়। সে সময় লোকমান হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, বিসিআইসির সার ডিলার মেসার্স জিসান ট্রেডার্সের মালিক জাহিদ হাসানের কাছ থেকে খুচরা ডিলার মালেক গাজী এসব সার সংগ্রহ করেছিলেন। চর কুকরিমুকরি এলাকার কৃষকদের জন্য নেওয়া সার ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোস্টগার্ড আটক করেছিল।

বরাদ্দ ও পাচারের উৎস খতিয়ে দেখছে প্রশাসন

চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, সার পাচারে ব্যবহৃত ট্রলার ও আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে আটক সার কোথা থেকে এসেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও পুলিশ উল্লেখযোগ্য তথ্য পায়নি। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়নগুলোতে কৃষকের সংখ্যা, আবাদি জমি ও প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় সার বরাদ্দ পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে উপকূলীয় নৌপথে কোস্টগার্ড ও পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা গেলে স্থানীয় বাজারে সারের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad