৪৫ বছরের আগেই মেনোপজে প্রতি ১৩ জনে ১ নারী, বাড়ছে হৃদরোগ ও হাড়ক্ষয়ের ঝুঁকি: আইসিডিডিআর,বি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৭ বিকাল
  • ১১২৫১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

বাংলাদেশে প্রতি ১৩ জন নারীর মধ্যে একজন ৪৫ বছর বয়সের আগেই মেনোপজে (স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হওয়া) পৌঁছে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি স্বাভাবিক নয় এবং এর ফলে হৃদরোগ, হাড়ক্ষয়, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও বিষণ্নতার মতো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইসিডিডিআর,বি জানায়, গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সাময়িকী বিএমজে গ্লোবাল হেলথ-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় ৪৪টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৮ জন নারীর জাতীয় ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (ডিএইচএস) তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, এসব দেশে গড়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ নারীর অকাল মেনোপজ হলেও বাংলাদেশে এ হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ১৩ জনে প্রায় একজন।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতে অকাল মেনোপজের হার ৮ শতাংশ, নেপালে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, বাংলাদেশে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে মেনোপজ হওয়াই স্বাভাবিক। তবে ৪৫ বছরের আগে স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হলে তাকে আর্লি মেনোপজ এবং ৪০ বছরের আগে হলে প্রিম্যাচিউর মেনোপজ বলা হয়। এ ধরনের মেনোপজে নারীরা সময়ের আগেই ইস্ট্রোজেন হরমোনের সুরক্ষামূলক প্রভাব হারান, ফলে হৃদরোগ, অস্টিওপোরোসিস (হাড়ক্ষয়), স্মৃতিভ্রংশ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শহরের তুলনায় গ্রামের নারীদের অকাল মেনোপজের ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেশি। শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থা, কর্মসংস্থান ও প্রজনন-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই বৈষম্য বহাল রয়েছে। গবেষকদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও জীবনযাত্রার মানের দীর্ঘদিনের বৈষম্যই এর অন্যতম কারণ।

শিক্ষার সঙ্গে অকাল মেনোপজের ঝুঁকিরও স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা নারীদের তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষা পাওয়া নারীদের ঝুঁকি ১১ শতাংশ, মাধ্যমিক শিক্ষিতদের ২৮ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে ৫৮ শতাংশ কম।

এ ছাড়া যেসব নারী ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন এবং প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, তাদের অকাল মেনোপজের ঝুঁকি অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান নেওয়া নারীদের তুলনায় কম পাওয়া গেছে।

দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইথিওপিয়ায় অকাল মেনোপজের হার সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ। এরপর রয়েছে ইন্দোনেশিয়া (১১ দশমিক ৫ শতাংশ) ও মিয়ানমার (১০ দশমিক ৩ শতাংশ)। অন্যদিকে সর্বনিম্ন হার জর্ডানে, মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। গ্যাবনে এ হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আর্মেনিয়ায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ।

গবেষণার প্রধান লেখক ও আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষক রাইসা বিনতে ইসলাম বলেন, অকাল মেনোপজ শুধু জৈবিক কারণের ফল নয়। কম শিক্ষিত নারী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান নেওয়া নারীরা ধারাবাহিকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। মেয়েদের শিক্ষা ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হলে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আইসিডিডিআর,বি-এর ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ ডিভিশনের সিনিয়র ডিরেক্টর ডা. আনিসুর রহমান বলেন, অকাল মেনোপজকে শুধু প্রজনন জীবনের একটি ধাপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে নারীদের মেনোপজের বয়স সম্পর্কে চিকিৎসকদের তথ্য নেওয়া উচিত। এতে ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় ধূমপানকে অকাল মেনোপজের সঙ্গে সম্পর্কিত একমাত্র প্রতিষ্ঠিত জীবনধারাগত ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই নারীস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে ধূমপান ত্যাগে সহায়তাকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।

তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। ফলে কোনো বিষয়কে অকাল মেনোপজের সরাসরি কারণ হিসেবে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এছাড়া ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, পরিবেশগত প্রভাব এবং হরমোনভিত্তিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ডিএইচএস জরিপে পর্যাপ্তভাবে না থাকায় সেগুলোর বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়নি।

গবেষকরা মেয়েদের শিক্ষায় আরও বিনিয়োগ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মানসম্মত প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং অকাল মেনোপজের জৈবিক ও সামাজিক কারণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad