জ্বালানি সংকটের মধ্যে চালুর উদ্যোগ বন্ধ থাকা কারখানা ১৭ ব্যাংক দেবে ৪১ হাজার কোটি টাকা

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়েছে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাত। তবে জ্বালানির এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বহু বছর যাবৎ বন্ধ থাকা কারখানা চালু ও স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজে ৪১ হাজার কোটি টাকা দিতে প্রাথমিকভাবে সম্মতি দিয়েছে ১৭টি ব্যাংক। চলতি সপ্তাহেই এসব ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রণোদনা তহবিলের আওতায় ঋণ বিতরণের জন্য ৩৭টি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে।


তবে শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, জ্বালানি সংকটের সমাধান না করে বন্ধ কারখানায় নতুন করে অর্থায়ন করা হলে তা ব্যাংকের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে সচল প্রতিষ্ঠানই যখন উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না, তখন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানা চালু করে উৎপাদন অব্যাহত রাখা কতটা সম্ভব—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।



বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বন্ধ কারখানা চালুর চেয়ে বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠান চালু আছে কিন্তু বন্ধ হওয়ার পথে, সেগুলোকে আগে টিকিয়ে রাখা জরুরি। তা না হলে ব্যাংকগুলো আবার ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তিনি বলেন, বিকেএমইএর সদস্য প্রায় ২ হাজার থেকে কমে বর্তমানে ৮০০-এর মতো সক্রিয় রয়েছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ‘গ্রিন সোয়েটার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালুর চেষ্টা গত এক বছরেও সফল হয়নি। সেখানে বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা কারখানাগুলো কীভাবে দ্রুত চালু করা সম্ভব হবে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।


অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কম সুদে পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এজন্য সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, স্বচ্ছতা, ঋণের যথাযথ ব্যবহার এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।


বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা তুলনামূলকভাবে লাভজনক। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি রয়েছে। ফলে নতুন করে বড় মূলধনী বিনিয়োগ না করেই তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। তবে তিনি বলেন, বর্তমানে শিল্প খাতের বড় সমস্যা গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট। এর কারণে অনেক সচল প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই সংকট সমাধান না হলে কারখানা সচল করার যেকোনো উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, প্রণোদনা তহবিলের অর্থ যাতে অপব্যবহার না হয়, সে জন্য একটি ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ ও ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোন প্রতিষ্ঠান ঋণ পাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত ও উৎপাদনক্ষম কি না এবং ঋণের অর্থ যথাযথ কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না—এসব বিষয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নজরদারি করা হবে।


প্রণোদনা প্যাকেজে অর্থ দিতে সম্মত হওয়া ১৭টি ব্যাংক হলো—সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, ব্র্যাক, সিটি, যমুনা, ডাচ্-বাংলা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, উত্তরা, প্রাইম, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি, পূবালী, ইস্টার্ন, মার্কেন্টাইল, ট্রাস্ট ও সাউথইস্ট ব্যাংক। চলমান সংকটে অনেক ব্যাংক টাকা দিতে আগ্রহী না হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জোর করে তহবিল নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।


ব্যাংক খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে বর্তমানে অতিরিক্ত তারল্য ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ রয়েছে সোনালী ব্যাংকে। ব্যাংকটি প্রণোদনা তহবিলে ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক দেবে ২ হাজার কোটি টাকা করে।


মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্যাসের সহজলভ্যতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বর্তমানে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে; আর কারখানায় যদি গ্যাসই না থাকে তবে শুধু কম সুদে ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তারা কী করবেন? গ্যাস ছাড়া তো ফ্যাক্টরি চলবে না ।


গত ২৩ মে বন্ধ কলকারখানা চালু এবং স্থবির অর্থনীতি চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো জোগান দেবে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে দেওয়া হবে। প্যাকেজের সবচেয়ে বড় ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ কারখানা চালুর জন্য। এ তহবিল থেকে বেসরকারি খাত গড়ে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad