দেশের বিভিন্ন কাস্টমস হাউস ও শুল্ক স্টেশনে আটকে থাকা অখালাসকৃত এবং চোরাচালানের অভিযোগে বাজেয়াপ্ত পণ্য দ্রুত, স্বচ্ছ ও আধুনিক পদ্ধতিতে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে নতুন স্থায়ী আদেশ জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
সোমবার (১৭ আগস্ট) ‘স্থায়ী আদেশ নং-৪৩/কাস্টমস/২০২৬’ জারি করা হয়। ২০২৩ সালের কাস্টমস আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। একই সঙ্গে ২০২৩ সালের ২ জুলাই জারি করা ৯১ নম্বর স্থায়ী আদেশটি প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
নতুন আদেশের মূল উদ্দেশ্য হলো কাস্টমস গুদামে জমে থাকা পণ্যের জট কমানো, সরকারি রাজস্ব আদায় ত্বরান্বিত করা এবং পণ্য নিষ্পত্তি কার্যক্রমে আরও গতি ও স্বচ্ছতা আনা।
ই-নিলামে অগ্রাধিকার
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বাজেয়াপ্ত বা অখালাসকৃত পণ্য নিষ্পত্তিতে অনলাইন বা ‘লাইভ ই-নিলাম’ পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ কোনো কারণে ই-নিলাম করা সম্ভব না হলে প্রচলিত প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে পণ্য বিক্রির সুযোগ থাকবে।
ই-নিলাম কার্যক্রম সহজ ও গতিশীল করতে ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ (ASYCUDA World) সিস্টেমের মাধ্যমে অখালাসকৃত পণ্যের তালিকা ও নিলাম লট প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংরক্ষিত মূল্য কমবে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ
নিলামের জন্য লট প্রস্তুতের পর পণ্যের গুণগত মান, পরিমাণসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় পরীক্ষা করে সংরক্ষিত মূল্য নির্ধারণ করা হবে। আমদানির প্রথম বছর বাদ দিয়ে পরবর্তী বছরগুলোতে বছরভিত্তিক ১০ শতাংশ হারে সংরক্ষিত মূল্য কমানোর বিধান রাখা হয়েছে। তবে এ হ্রাস সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারবে।
ই-নিলামে অংশ নিতে দরদাতাকে নির্ধারিত মূল্যের ৫ শতাংশ জামানত ই-পেমেন্টের মাধ্যমে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত হিসাবে জমা দিতে হবে।
পচনশীল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বিশেষ ব্যবস্থা
পচনশীল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন আদেশে। চিনি, লবণ, ডাল ও সয়াবিন তেলের মতো পণ্য এনবিআর নির্ধারিত মূল্যে সরাসরি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর কাছে বিক্রি করা যাবে।
খালাস না হওয়া পচনশীল কোনো পণ্য খাওয়ার উপযোগী থাকলে এবং এর মেয়াদ তিন মাসের কম থাকলে তা সরকারি এতিমখানায় বিনামূল্যে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যবহারের অনুপযোগী বা ক্ষতিকর পণ্য ধ্বংসের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের ‘ধ্বংস কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
মূল্যবান ধাতু ও বিশেষ পণ্যের ক্ষেত্রে আলাদা ব্যবস্থা
আটক করা সোনা, রুপা, প্ল্যাটিনাম, হীরা এবং বৈদেশিক মুদ্রা যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কাস্টমস গুদাম বা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হবে।
বিস্ফোরক, যুদ্ধাস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে সশস্ত্র বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হবে। মাদক, মদ ও বিদেশি সিগারেট বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া শিল্পকারখানায় ব্যবহারের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)-এর কাছে ন্যূনতম মূল্যের ৬০ শতাংশ দামে বিক্রি করা যাবে।
নিলামের আগে দাবিদারকে নোটিশ
পণ্য নিলামে তোলার আগে আমদানিকারক বা দাবিদারকে সাত কার্যদিবস সময় দিয়ে নোটিশ দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো সাড়া না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পণ্য নিলামে তোলা যাবে।
নিলাম থেকে পাওয়া অর্থ নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার অনুযায়ী বণ্টন করা হবে। প্রথমে নিলাম পরিচালনার ব্যয়, এরপর শিপিং বা কনটেইনার ভাড়া, সরকারি কাস্টমস শুল্ক ও কর এবং জিম্মাদারের পাওনা পরিশোধ করা হবে। সব পাওনা পরিশোধের পর অর্থ অবশিষ্ট থাকলে পণ্যের মালিক আবেদন করলে তা ফেরত দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
নিলাম কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি, অনিয়ম বা জালিয়াতির চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নতুন স্থায়ী আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক