পররাষ্ট্রনীতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সরকারের প্রথম ছয় মাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আত্মমর্যাদাসম্পন্ন অবস্থানকে সমুন্নত রেখেছেন বলে মন্তব্য করেছেন আমার দেশের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহমুদুর রহমান। তাঁর মতে, সরকারের দৃঢ় ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি সন্তুষ্ট এবং একই সঙ্গে বিস্মিত হয়েছেন।
বুধবার (১৯ আগস্ট) প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে মাহমুদুর রহমান এসব কথা বলেন।
লেখায় তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালের শেষ দিক থেকে ২০১৮ সালে নির্বাসনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে তাঁর আলোচনায় মনে হয়েছিল, ভারতীয় আধিপত্যের বিষয়ে দলটি আগের তুলনায় কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে দিল্লিতে পাঠানোর বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন। তবে তখন ভারতীয় নেতৃত্ব বিএনপির উদ্যোগকে গুরুত্ব দেয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
মাহমুদুর রহমান বলেন, নির্বাসিত জীবনে বিএনপির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ সীমিত ছিল। এ সময় তিনি শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে এবং ভারতীয় আধিপত্যের বিরোধিতায় নিজের অবস্থান থেকে কাজ করে গেছেন। তাঁর অভিযোগ, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি সক্রিয় থাকলেও ভারতের বিষয়ে দলটির নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে এক ধরনের দ্বিধা ছিল।
ভারতীয় পণ্য বর্জন আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বিএনপির নেতা রুহুল কবির রিজভীর ভারতীয় চাদর ছুড়ে ফেলে দেওয়ার ঘটনাটিও স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে বিএনপি হয়তো পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল নিয়েছিল। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি দলটির ২০১৮ সালের পরবর্তী অবস্থানে সন্তুষ্ট হতে পারেননি।
জুলাই বিপ্লবের পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মাহমুদুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও বিএনপির কয়েকজন নেতার বক্তব্যে ভারতের বিষয়ে তুলনামূলক নমনীয়তা দেখা গেছে। জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও নির্বাচন পর্যন্ত ভারত প্রশ্নে সুবিধাবাদী অবস্থান ছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তরুণ নেতারা ভারতকে সন্তুষ্ট করার রাজনীতি করেননি বলে প্রশংসা করেন তিনি। তাঁর মতে, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণকারী কোনো রাজনৈতিক দল ভারতের আধিপত্যবাদী নীতির প্রতি তোষামোদ করতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ভারত দিয়ে শুরু না হয়ে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে শুরু হওয়াকে পররাষ্ট্রনীতিতে দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে দেখেছেন মাহমুদুর রহমান। তাঁর মতে, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দিল্লির প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
মাহমুদুর রহমানের দাবি, ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা সম্ভবত আশা করেছিলেন, তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরে ভারত যাবেন। একইভাবে ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করেও ভারত তাঁকে সফরে নেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে তিনি মনে করেন। তবে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে না গিয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটিকে তিনি যথাযথ বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কার্যকর সম্পর্ক প্রয়োজন হলেও গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সফর কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সাইডলাইনে বা অপর্যাপ্ত প্রস্তুতির মাধ্যমে হওয়া উচিত নয়। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও দরকষাকষি প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।
লেখায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যুও তুলে ধরেন মাহমুদুর রহমান। এর মধ্যে শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি করা ব্যক্তিদের প্রত্যাবর্তন, গঙ্গা পানিচুক্তি, তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা, পুশইন, মাদক ও চোরাচালান, বাণিজ্য, যোগাযোগ, ক্রিকেট এবং ভিসা সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর মতে, এসব বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আন্তরিক ও অর্থবহ আলোচনা প্রয়োজন। চলতি বছরের মধ্যেই উভয় দেশের জন্য সুবিধাজনক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর হওয়া উচিত বলেও মত দিয়েছেন তিনি।
সবশেষে মাহমুদুর রহমান বলেন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা চাপ উপেক্ষা করে তারেক রহমান পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগতভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে সফল হয়েছেন। এ জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক