জেলার দায়িত্ব মন্ত্রীদের হাতে, ফিরছে মাঠপর্যায়ের জবাবদিহিতা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৮ দুপুর
  • ৫৩০৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
দেশের ৬৪ জেলার দায়িত্ব আবারও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপদের মধ্যে বণ্টন করেছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তদারক ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবেন তাঁরা।

এ সিদ্ধান্তকে মাঠ প্রশাসনে জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের কাছে সরকারের সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন লেখক ও নাট্যকার অদিতি করিম।

সম্প্রতি এক মতামত নিবন্ধে তিনি বলেন, ২০২১ সালে করোনা মহামারির সময় দেশের ৬৪ জেলার তদারকির দায়িত্ব একজন করে সচিবের হাতে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর মতে, ওই সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা অনেকটাই সংকুচিত হয় এবং মাঠ প্রশাসনে আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব বাড়ে।

অদিতি করিমের ভাষ্য, সংসদীয় গণতন্ত্রে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা থাকলেও ওই সময়ে জেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার বড় অংশ আমলাদের হাতে চলে যায়। মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের স্থানীয় সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হতো। এতে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের জবাবদিহিতার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে।

তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সমস্যা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে প্রত্যেক জেলায় একজন করে মন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ওই মন্ত্রীরা নিয়মিত জেলায় গিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় সভা করতেন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করতেন।

এসব সভা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের উপস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের অভিযোগ ও সমস্যার কথা জানা হতো। পরে ঢাকায় ফিরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হতো। লেখকের মতে, এর ফলে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক জবাবদিহিতার একটি কাঠামো তৈরি হয়েছিল।

তবে ২০২০ সালে জেলার দায়িত্ব আবার সচিবদের হাতে দেওয়ার ফলে সেই ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে বলে তিনি মনে করেন।

এবারের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে অদিতি করিম বলেন, গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৬৪ জেলার দায়িত্ব ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও তিনজন জাতীয় সংসদের হুইপের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে। কোনো কোনো মন্ত্রীকে একটি জেলা, আবার কাউকে দুই থেকে তিনটি জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন জেলায় উন্নয়ন বরাদ্দ থাকলেও দুর্নীতির মাধ্যমে তার বড় অংশ লুটপাট হয়েছে। লুট করা অর্থের একাংশ বিদেশে পাচার এবং অন্য অংশ মাদকসহ সামাজিক অবক্ষয়, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে সমন্বয় ও তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার আইনগত ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখেই তাঁদের তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মাঠ প্রশাসনের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় করাই তাঁদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ এবং কার্যপ্রণালি বিধিমালার সংশ্লিষ্ট বিধানের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অথবা তাঁর কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা হয়।

অদিতি করিমের মতে, বর্তমান সরকারের এ সিদ্ধান্ত সাহসী ও সময়োপযোগী। তাঁর ভাষ্য, ২০২১ সালের পর মাঠ প্রশাসনে আমলাদের ক্ষমতা বেড়ে গেলেও জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে তাদের জবাবদিহিতা যথেষ্ট ছিল না। আগের সময়ে অনেক জনপ্রতিনিধি জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় প্রশাসনের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নিতে পারেননি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় তাঁদের কাছে এলাকার মানুষের প্রত্যাশা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে। ফলে জেলার তদারকির দায়িত্ব মন্ত্রীদের হাতে দেওয়ার মাধ্যমে একদিকে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা জোরদার হবে, অন্যদিকে প্রান্তিক পর্যায়ে মানুষের সেবা পাওয়ার প্রতিবন্ধকতা কমবে।

লেখকের মতে, জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনের জবাবদিহিতা বাড়বে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয় তৈরি হয়ে সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।


অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad