তুরস্কের ‘সন্ত্রাসমুক্ত তুরস্ক’ উদ্যোগ ধীরে ধীরে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ‘সন্ত্রাসমুক্ত অঞ্চল’ গঠনের ধারণায় রূপ নিচ্ছে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখার লক্ষ্যেও এগোচ্ছে আঙ্কারা।
তুরস্কে পিকেকে আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়লেও ইরাকের কান্দিল পর্বতমালা ও সিরিয়ার কিছু এলাকায় সংগঠনটির উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে আঙ্কারার জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ফলে পিকেকের বিলুপ্তির ঘোষণা তুরস্কের পাশাপাশি ইরাক, ইরান ও বিশেষ করে সিরিয়ার জন্য কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সিরিয়ায় পিকেকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওয়াইপিজি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। একপর্যায়ে সিরিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পরাজিত করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
এই পরিস্থিতিতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, সিরিয়ার কুর্দিরা দেশের অন্য নাগরিকদের মতো সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবে। ফলে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের আর প্রয়োজন নেই।
এরপর ওয়াইপিজি নিজেদের বিলুপ্তি এবং সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একীভূত হওয়ার ঘোষণা দেয়। একই সময়ে সংগঠনটির অন্যতম নেতা ফেরহাত আবদি শাহিনকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার খবরও সামনে আসে। এর মধ্য দিয়ে আরব, কুর্দি ও তুর্কমেন জনগোষ্ঠীর অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের অধীনে সহাবস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তুরস্কেও সন্ত্রাসবিরোধী উদ্যোগকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দেশটির পার্লামেন্ট সন্ত্রাসবিরোধী একটি কাঠামো আইন অনুমোদন করেছে। এ প্রক্রিয়া তদারকির জন্য একটি বিশেষ কমিশনও গঠন করা হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজ কমিশনের প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
ইরাকও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে দেশটির সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র ত্যাগ, আত্মসমর্পণ অথবা ইরাকি জাতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাত কমিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পিকেকের বিলুপ্তি তুরস্কের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি সিরিয়া ও ইরাকের স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হুমকি কমে এলে সিরিয়া ও ইরাক সীমান্তে তুরস্কের সামরিক তৎপরতাও কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে দেশটির সামরিক সক্ষমতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অন্যান্য কৌশলগত অগ্রাধিকারে ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।
সিরিয়া ও ইরাকে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হলে তা তুরস্কের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকেও আরও শক্তিশালী করতে পারে। সব মিলিয়ে পিকেকে ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় তাদের একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স