সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ জবানবন্দি দেওয়ার সময় এ কথা বলেন তিনি। বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ওই দুই বিএনপি নেতাকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির বিরুদ্ধে ১৫তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আলী আহমেদ।
জবানবন্দিতে পুলিশ কর্মকর্তা আলী আহমেদ বলেন, তাঁর বর্তমান বয়স আনুমানিক ৪৭ বছর। বর্তমানে তিনি বরিশাল জেলা সিআইডিতে পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত। তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত উজিরপুর থানায় কর্মরত ছিলেন।
সাক্ষী জানান, ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে বরিশাল জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার এ কে এম এহসান উল্লাহ উজিরপুর থানায় আসেন। সেখানে থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল ইসলামের সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ মিনিট কথা বলে তিনি চলে যান।
এরপর ওসি তাঁকে ডেকে এএসআই জসীম উদ্দিন ও এএসআই মাহবুলকে থানার এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য ‘সিসি’ দেওয়ার নির্দেশ দেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন আলী আহমেদ। তিনি বলেন, পুলিশ সুপারের নির্দেশনা অনুযায়ী ওই দুই এএসআই দায়িত্ব পালন করবেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকবেন বলে তাঁকে জানানো হয়েছিল।
আলী আহমেদ বলেন, তিনি ডিউটি অফিসারকে ওসির নির্দেশনা জানিয়ে এএসআই জসীম উদ্দিন ও এএসআই মাহবুলকে বিশেষ অভিযান পরিচালনার অনুমতি দিতে বলেন। দাপ্তরিক কার্যক্রম শেষে তিনি বাসায় চলে যান।
পরদিন সকালে টেলিভিশনের সংবাদে তিনি দেখতে পান, পার্শ্ববর্তী আগৈলঝাড়া থানা এলাকায় টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লা নামে দুজন পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।
সাক্ষী আরও বলেন, ওই দিন বিকেলে থানায় গেলে ওসি তাঁকে এএসআই মাহবুল ও এএসআই জসীমকে পরবর্তী ১০ দিন কোনো দায়িত্ব না দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি ওসির নির্দেশ অনুযায়ী তাঁদের ডিউটি দেওয়া থেকে বিরত রাখেন।
জবানবন্দিতে আলী আহমেদ বলেন, পরবর্তী সময়ে পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের মধ্যে আলোচনা হতে থাকে যে, আগৈলঝাড়ার ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা এএসআই মাহবুল ও এএসআই জসীম ঘটিয়েছেন। পরে তিনি জানতে পারেন, তৎকালীন পুলিশ সুপারের নির্দেশ ও তত্ত্বাবধানে ওই দুই এএসআই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন।
তিনি আরও বলেন, ১০ দিন পর এএসআই মাহবুল ও এএসআই জসীম থানায় ফিরে আসেন। তাঁদের কথাবার্তা অসংলগ্ন এবং চালচলন অস্বাভাবিক ছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
এরপর ওই দুই এএসআই ওসির কাছে আরও ১০ থেকে ১৫ দিনের ছুটি চান। তখন ওসি তাঁদের আরও ১০ থেকে ১৫ দিন দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দেন বলে জানান আলী আহমেদ।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, এএসআই মাহবুল ও এএসআই জসীম অত্যন্ত বেপরোয়া ছিলেন। তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হলে তাঁরা পুলিশ সুপার ও তৎকালীন সংসদ সদস্য হাসানাত আবদুল্লাহর নাম উল্লেখ করে অন্যদিকে চলে যেতেন এবং ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতেন না বলে তিনি দাবি করেন। তাঁদের ভয়ে অন্য কর্মকর্তা ও সদস্যরা ঠিকভাবে কথা বলতেন না বলেও জানান তিনি।
আলী আহমেদ বলেন, তৎকালীন সরকারের আমলে বরিশাল জেলায় আরও চার-পাঁচটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। এ ছাড়া সারা দেশেও এ ধরনের অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
সবশেষে সাক্ষী বলেন, আগৈলঝাড়ার ‘ক্রসফায়ার’ সংঘটিত করার কারণে এএসআই মাহবুল ও এএসআই জসীমকে ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স