বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর ভাষা ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো মানুষের সঙ্গে সরাসরি পারস্পরিক যোগাযোগ। বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলা, গল্প শোনা, খেলাধুলা, চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ, মুখের অভিব্যক্তি বোঝা এবং আশপাশের পরিবেশে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শিশুর মস্তিষ্ক ভাষা ও সামাজিক দক্ষতা অর্জন করে। অন্যদিকে, টেলিভিশন, মোবাইল বা ট্যাবের মতো স্ক্রিন মূলত একমুখী যোগাযোগ তৈরি করে, যা বাস্তব কথোপকথন ও খেলাধুলার বিকল্প হতে পারে না।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হতে হবেশিশুর মধ্যে কিছু আচরণ বা বিকাশগত পরিবর্তন দেখা দিলে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। যেমন—
১. দেরিতে কথা বলা: বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক শব্দ বা বাক্য বলতে না পারা।
২. চোখে চোখ না রাখা: কথা বলার সময় সরাসরি চোখের দিকে না তাকানো।
৩. নামের ডাকে সাড়া না দেওয়া: বারবার নাম ধরে ডাকলেও সাড়া না দিয়ে অন্য কাজে মগ্ন থাকা।
৪. সামাজিক যোগাযোগে অনীহা: পরিবারের সদস্য বা সমবয়সিদের সঙ্গে মিশতে কিংবা খেলতে অনাগ্রহ দেখানো।
৫. যৌথ মনোযোগের ঘাটতি: অন্য কেউ কোনো বস্তু ইশারা করে দেখালে সেদিকে মনোযোগ না দেওয়া।
৬. খেলার দক্ষতা কমে যাওয়া: কল্পনাভিত্তিক বা দলগত খেলায় অংশ না নিয়ে একা একা একই ধরনের কাজে আগ্রহ দেখানো।
৭. স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা: মোবাইল বা টেলিভিশন বন্ধ করে দিলে প্রচণ্ড কান্নাকাটি করা কিংবা জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলা।
৮. নির্দেশনা বুঝতে সমস্যা: সহজ নির্দেশনা বুঝতে না পারা অথবা নিজের প্রয়োজন ইশারার মাধ্যমে প্রকাশ করা।
তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে সমস্যা হয়েছে বা শিশুর অটিজম হয়েছে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। শ্রবণ সমস্যা কিংবা অন্যান্য বিকাশগত কারণেও এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই শিশুর সঠিক মূল্যায়নের জন্য শিশু বিশেষজ্ঞ অথবা স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপির ভূমিকাশিশুর ভাষা ও যোগাযোগের সমস্যা নিরসনে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট (এসএলটি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা শিশুর মনোযোগ, খেলার দক্ষতা এবং যোগাযোগের আগ্রহ মূল্যায়ন করে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিকেন্দ্রিক থেরাপি পরিকল্পনা তৈরি করেন।
এ ছাড়া অভিভাবকদের ‘প্যারেন্ট কোচিং’-এর মাধ্যমে শিশুর সঙ্গে দৈনন্দিন খেলাধুলা ও কথোপকথনের পদ্ধতি শেখানো হয়। এর ফলে বাবা-মা ঘরেই শিশুর ভাষা ও সামাজিক বিকাশে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন।
যা করবেন অভিভাবকেরাবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহার এড়িয়ে চলা উচিত। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহার দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখা এবং এ সময় অভিভাবকের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
শিশুর স্ক্রিননির্ভরতা কমাতে অভিভাবকদের কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দুই বছরের কম বয়সী শিশুর বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম শূন্যে নামিয়ে আনা এবং দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে তা দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখা জরুরি।
স্ক্রিন বন্ধ করে শিশুর সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলা, ছড়া বলা, গল্প করা এবং একসঙ্গে খেলাধুলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ঘরের ছোটখাটো নিরাপদ কাজে শিশুকে সঙ্গে রাখা যেতে পারে। এতে তার মনোযোগ, যোগাযোগ এবং নির্দেশনা বোঝার দক্ষতা বাড়তে পারে।
শুধু মোবাইল কেড়ে নিলেই হবে না; এর পরিবর্তে শিশুকে দিতে হবে বাবা-মায়ের পর্যাপ্ত ‘কোয়ালিটি টাইম’। শিশুর ভাষা ও যোগাযোগের সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা ও থেরাপি শুরু করা গেলে তার দক্ষতার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)