রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘কোনো মাকে সন্তানের জন্য কিংবা কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না। প্রতিটি গুমের ঘটনায় জড়িত অপরাধী সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ ছাড়া সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্য, সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
গুম মানবতাবিরোধী অপরাধরাষ্ট্রপতি বলেন, ৩০ আগস্ট বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করার দিন। একই সঙ্গে এ দিনটি তাঁদের স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা, বেদনা ও অনিশ্চয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। বছরের পর বছর প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন ও স্বজনদের প্রতি তিনি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানান।
গুমকে সাধারণ অপরাধ নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গুমের মাধ্যমে শুধু একজন মানুষকেই কেড়ে নেওয়া হয় না; তাঁর পরিবারের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিও নষ্ট হয়। এটি একটি জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু গুমের মাধ্যমে এসব মৌলিক অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘিত হয়।
দেড় দশকের ‘আয়নাঘর’ প্রসঙ্গবিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের ওপর চেপে বসেছিল বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে অনেক মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়া, গুম এবং গোপনে হত্যা করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এসব গুরুতর অপরাধ দীর্ঘদিন অস্বীকার করা হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম এবং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ নিখোঁজ হওয়া অসংখ্য মানুষের কথা স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিন বেদনা, অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মধ্যে কাটাতে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিকদেরও বছরের পর বছর অন্ধকার ও আলো-বাতাসহীন ‘আয়নাঘরে’ আটকে রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে সমাজে ফিরে এসেছেন। তবে এখনো দেশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা আর ফিরে আসেননি।
‘প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে’রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালে গণতন্ত্র, সাম্য, বাক্স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়েছেন। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশেই গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভয় ও ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল। জাতীয় ইতিহাসে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-খুনের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একদিন গুম, খুন, অত্যাচার ও নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।
এ ছাড়া বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের জনগণকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তাঁদের অনেকেই গুম-খুনের শিকার হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ১ হাজার ৫৬৯ গুমগুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত।
নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে জোরপূর্বক গুম ও গোপনে হত্যার চিত্র তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলেও জানান তিনি। রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখতে দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে এসব বর্বর কর্মকাণ্ড সংঘটিত করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে গুমের বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে সামনে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
গুম প্রতিরোধে নতুন আইনএবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ভুক্তভোগী আগে, এখনই পদক্ষেপ’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া এবং গুমকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচারের কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে চলছে।
‘শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ নয়’গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষা, সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করা পরিবারগুলোর মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
‘রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, প্রতিহিংসা থাকবে না’রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ চান, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, তবে সেই ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।
রাষ্ট্রপতির মতে, একটি দেশের উন্নয়ন ও সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী, কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করেন—তার ওপরই রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্য নির্ভর করে।
তিনি বলেন, এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতেই তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব। এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রপতি এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান, যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য ও মর্যাদা হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি; সুশাসন হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি; জবাবদিহিতা ও বাক্স্বাধীনতা হবে গণতন্ত্রের শক্তি এবং ইনসাফ হবে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার।
সবশেষে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, গুম ও বিচারহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে বাংলাদেশ সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার আলোকিত পথে এগিয়ে যাবে। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের স্বজনদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, সমবেদনা ও সহমর্মিতাও জানান রাষ্ট্রপতি।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক