তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেখা যায়, যে আশঙ্কাগুলোকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের তিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেননি, সেগুলোর অনেকটাই বাস্তবে পরিণত হয়নি। আফগানিস্তান সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠেনি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে হামলার জন্য কোনো ‘লঞ্চপ্যাড’ও তৈরি হয়নি।
এখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও সামরিক বিজয়ের সম্ভাবনা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবার অবস্থান পরিবর্তন করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষেও যুক্তি দিয়েছেন।
বসন্তে এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমাদের সেখানে থাকতেই হবে এমন নয়। আমাদের তাদের তেলের প্রয়োজন নেই। তাদের কাছে থাকা কোনো কিছুরই আমাদের প্রয়োজন নেই। তবে আমরা আমাদের মিত্রদের সহায়তা করতে সেখানে আছি।’
আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাই ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন জেনারেল ও নীতিনির্ধারকদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে—আফগানিস্তান থেকে যুদ্ধ বন্ধ করে বেরিয়ে আসা কেন এত কঠিন হয়েছিল? আর সেই যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে দীর্ঘ সময় লেগেছিল, তার অভিজ্ঞতা ইরান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান সংকট সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়?
যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, শেষ করা তত নয়দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে উত্থানের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র যেসব যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় প্রতিটিতেই একসময় যুদ্ধ বন্ধ করা কিংবা সেখান থেকে সরে আসার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যান্ড করপোরেশনের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু আর. হোয়েনের মতে, গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র যেসব যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার অধিকাংশই ছিল মূলত ‘সাম্রাজ্যের পাহারা দেওয়া’। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র কোনো অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এসব যুদ্ধে অংশ নেয়নি।
বিন লাদেনের মৃত্যুর পরও যুদ্ধ চলেছে২০১১ সালের মে মাসে ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এক দশকের ড্রোন হামলায় আল-কায়েদা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর আগে আফগানিস্তান শাসন করা এবং আল-কায়েদাকে আশ্রয় দেওয়া তালেবানকে পুরোপুরি নির্মূল করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
আফগানিস্তানে মার্কিন কমান্ডারদের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা কার্টার মালকাসিয়ান পরে লিখেছেন, সে সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে বর্তমান জ্ঞান থাকলে তিনি এবং আরও অনেক মার্কিন কর্মকর্তা আগেই সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিতেন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষা দপ্তর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিল কয়েকটি কারণে। এর মধ্যে ছিল বিশ্বমঞ্চে মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ, বিশ্বস্ত আফগান মিত্রদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং যুদ্ধ থেকে সরে গেলে নিহত ও আহত মার্কিন সেনাদের আত্মত্যাগকে অসম্মান করা হবে—এমন ধারণা।
মালকাসিয়ানের মতে, বহু সামরিক কর্মকর্তার কাছে যুদ্ধ ছেড়ে দেওয়া তাদের বছরের পর বছর ধরে পাওয়া প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার পরিপন্থী ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘সহজভাবে বললে, আমেরিকানরা আগে আফগানিস্তান ছাড়েনি, কারণ মার্কিন সামরিক বাহিনী জয়ের জন্যই লড়াই করে।’
পরাজয়ের আশঙ্কা, লক্ষ্য পরিবর্তনরাজনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্ট নেতারাও বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা এবং যুদ্ধে পরাজয়ের জন্য নির্বাচনে তাদের কী ধরনের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
২০১১ সাল নাগাদ আফগানিস্তানে মার্কিন সেনার সংখ্যা কমতে শুরু করে। তালেবান বুঝতে পেরেছিল, তাদের মূল কাজ হলো মার্কিন সেনা ও যুদ্ধের ব্যয় বহনে ক্লান্ত আমেরিকান জনগণের ধৈর্যের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকা।
তালেবানকে পরাজিত করার সম্ভাবনা যত কমতে থাকে, মার্কিন নীতিনির্ধারকেরাও ততই যুদ্ধের লক্ষ্য পরিবর্তন করতে থাকেন। হতাহতের সংখ্যা কমানো, যুদ্ধের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ও অজনপ্রিয় আফগান সরকারকে টিকিয়ে রাখাই তখন বড় লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে অপেক্ষাকৃত সংযত অবস্থানের পক্ষে থাকা প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের পরিচালক রোজমেরি কেলানিক এ পরিস্থিতিকে এমন এক চিকিৎসকের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যিনি জানেন রোগী মারা যাবে; কিন্তু আশা করেন, তাঁর দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর যেন রোগীর মৃত্যু হয়।
ইরানেও কি একই পরিণতি হতে পারে?ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পরও আফগান যুদ্ধ আরও প্রায় এক দশক চলেছে। এ সময়ে আরও ৮৬৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হন।
যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন কমান্ডারদের অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন, তাদের এমন এক যুদ্ধে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে সাফল্যের সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। আফগানিস্তানে শেষ মার্কিন কমান্ডার জেনারেল অস্টিন এস. মিলার ২০১৮ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার মানসিকতা স্মরণ করে বলেছিলেন, তিনি আশা করেছিলেন দায়িত্ব শেষে ‘খুবই ক্লান্ত’ হয়ে ফিরবেন এবং তাঁর ‘মর্যাদা হ্রাস পাবে’।
আফগানিস্তানের সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর ইরান যুদ্ধেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ চলতি বছরের শুরুতে বলেছিলেন, ইরানের যুদ্ধ আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তরুণ আর্মি ন্যাশনাল গার্ড কর্মকর্তা হিসেবে তিনি নিজেও ওই দুই যুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, সেসব যুদ্ধ ছিল ‘জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী ফাঁদ’।
ইরানের ক্ষেত্রে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অভিযান হবে ‘লেজার-ফোকাসড’, প্রাণঘাতী, দ্রুত এবং ‘নির্ণায়ক’। তাঁর ভাষায়, ‘এটি ইরাক নয়। এটি অন্তহীন নয়।’
কিন্তু ইরান মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। পরে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বীকার করেন, শুধু মার্কিন বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরানকে পরাজিত করা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করা সম্ভব নাও হতে পারে।
এরপর বিমান হামলায় অর্জন করা সম্ভব হয়নি এমন লক্ষ্য পূরণে মার্কিন প্রশাসন হরমুজ প্রণালিতে ইরানের রপ্তানির ওপর নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নিয়েছে। কিছু জাহাজ ও তেল রপ্তানি আবারও প্রণালি দিয়ে চলাচল শুরু করার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা গেলেও মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা এখন আর দ্রুত বিজয়ের কথা বলছেন না। বরং তারা কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় ধরে ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার অভিযানের কথা বলছেন।
মার্কিন নৌবাহিনী দীর্ঘদিনের বিভিন্ন মোতায়েনের কারণে এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। এরপরও কতদিন এই অবরোধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব—এমন প্রশ্নের জবাবে হেগসেথ বলেছেন, ‘যতদিন প্রয়োজন, ততদিন—অনির্দিষ্টকাল।’
যুদ্ধ থেকে সরে আসার মূল্যও কম নয়ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক বাহিনীর চ্যালেঞ্জ আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ। তালেবান নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়েছিল। ইরানের নেতারাও এখন নিজেদের টিকে থাকার জন্য লড়াই করছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান যুদ্ধে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। ফলে আফগানিস্তানের তুলনায় এই যুদ্ধ থেকে সরে আসার রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্যও কম হতে পারে।
সামরিক বিশেষজ্ঞ থমাস জি. মাহনকেনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারে। যুদ্ধ শুরুর আগে নৌপথটি উন্মুক্তই ছিল। তবে ইরান কয়েক দশক ধরে ওই এলাকায় নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে ও শক্তিশালী করেছে।
ফলে নৌপথ পুরোপুরি খুলে দিতে স্থলবাহিনী মোতায়েন করে অভিযান চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এমন অভিযানে প্রাণ ও অর্থের যে মূল্য দিতে হবে, তা ট্রাম্প প্রশাসন কিংবা যুদ্ধবিরোধী মার্কিন জনগণ কতটা মেনে নেবে—সেটিই বড় প্রশ্ন।
আফগানিস্তানের পরাজয়কে ‘বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপনআফগান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পাঁচ বছর পূর্তিতে তিন অবসরপ্রাপ্ত মেরিন সেনাকে বীরত্বের জন্য পদক দেন হেগসেথ। তাদের দুজন কাবুল বিমানবন্দরে আত্মঘাতী হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন। আহত অবস্থাতেও তারা অন্যদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে সহায়তা করেছিলেন।
অনুষ্ঠানে হেগসেথ তাদের বীরত্বের প্রশংসা করেন। তবে এর পাশাপাশি দীর্ঘ ও হতাশাজনক আফগান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরাজয়কে সেখানে দায়িত্ব পালনকারী সেনাদের ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টাও ছিল।
মেরিন সেনাদের উদ্দেশে হেগসেথ বলেন, তারা একটি ‘প্রাণঘাতী, গর্বিত ও অপরাজিত বাহিনীর অগ্রভাগ’। দীর্ঘদিন ধরে প্রাপ্য পদকও তাদের দেওয়া হয়।
তবে পুরো আয়োজনজুড়ে একটি বিষয় অনুচ্চারিতই থেকে যায়—আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক