জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে হিমালয়, বাড়ছে দুর্যোগের ঝুঁকি

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৪১ দুপুর
  • ৪৬৭৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে হিমালয়ের পরিবেশ। গলছে হিমবাহ, কমছে বরফ ও তুষারের পরিমাণ। একই সঙ্গে বাড়ছে পাথরধস, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি এলাকায় নানা ধরনের ঝুঁকি। নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা এবং পাকিস্তানের কারাকোরাম অঞ্চলে পরপর প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা হিমালয়ের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বুধবার নেপালের তিব্বত সীমান্তের কাছে ২৩ হাজার ৭৩৪ ফুট উঁচু লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর পাশে হিমবাহ ও পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে পানি, কাদা ও পাথরের বিশাল স্রোত প্রায় ৬০ মাইল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

এর কয়েক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকে তুষারধসে ১০ জন পর্বতারোহী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নেপালের খ্যাতিমান পর্বতারোহী নির্মল পুরজা। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এ দুটি ঘটনায় হিমালয় ও কারাকোরাম অঞ্চলে বরফ ও তুষারের দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক আরবিন্দ্র খাড়কা বলেন, হিমালয়ের হিমবাহগুলো বছরে গড়ে প্রায় এক মিটার করে বরফ হারাচ্ছে। তাঁর মতে, এই সমস্যা শুধু এভারেস্টকেন্দ্রিক নয়; পুরো হিমালয় অঞ্চলই বরফ হারাচ্ছে।

বরফ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু পর্বতারোহণের ওপরই পড়ছে না, বদলে যাচ্ছে পাহাড়ি এলাকার স্বাভাবিক ভূপ্রকৃতিও। নেপাল ন্যাশনাল মাউন্টেন গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তুল সিং গুরুং বলেন, হিমালয়ের অনেক এলাকায় তুষার ও বরফ সরে গিয়ে খালি পাথর বেরিয়ে পড়ছে। ফলে আগে পরিচিত অনেক পথের চেহারা বদলে গেছে। প্রায় প্রতিটি পাহাড়ি এলাকাতেই এখন পাথরধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাংটাংয়ের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, হিমবাহের কোনো অংশ ভেঙে পড়ার পর ঢিলা পাথর ও ধ্বংসাবশেষ বরফ গলা ভেজা মাটির ওপর দিয়ে নিচের দিকে নেমে গিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে থাকতে পারে।

ঝুঁকিতে নেপালের পর্যটন অর্থনীতি

হিমালয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নেপালের অর্থনীতিরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশটির মোট অর্থনীতির ৬ দশমিক ১ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। ২০২৩ সালে এ খাতে প্রায় ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ছিল, যা দেশটির মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ১৫ শতাংশ।

২০২৫ সালে ১১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক নেপাল সফর করেন। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি পর্যটকের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ট্রেকিং ও পর্বতারোহণ। এ খাতকে কেন্দ্র করে দেশটিতে ৩ হাজারের বেশি ট্রেকিং এজেন্সি গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক গাইড, পোর্টার, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও হেলিকপ্টার সেবা এ খাতের সঙ্গে যুক্ত।

পর্বতারোহণ নেপালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎসও। চলতি বছরের বসন্ত মৌসুমে ৩১টি পর্বতে ওঠার জন্য ১ হাজার ১৯৫ জন পর্বতারোহী অনুমতি নিয়েছেন। এ থেকে সরকার প্রায় ৯০ লাখ ডলার রয়্যালটি পেয়েছে। শুধু এভারেস্টে বিদেশি পর্বতারোহীদের বসন্তকালীন অনুমতিপত্রের মূল্য ১৫ হাজার ডলার।

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থনৈতিক খাতও ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা জানিয়েছেন, গত দুই দশকে তাঁরা পাহাড়ের চেহারায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন। এভারেস্টের খুম্বু আইসফলেও বরফের ফাটল ও বরফের কাঠামো আগের তুলনায় বদলে গেছে।

২০০৪ সালে খুম্বু আইসফলের অসংখ্য ফাটল পার হতে অ্যালুমিনিয়ামের মই ব্যবহার করতে হতো। চলতি বছর সেখানে কিছু অংশে মাত্র দুটি জায়গায় মই ব্যবহারের প্রয়োজন হয়েছে।

প্রযুক্তিতে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন প্রযুক্তি কিছুটা ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করছে। পর্বতারোহীরা এখন উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস, জিপিএস, তুষারধস শনাক্তকারী যন্ত্র, হালকা সরঞ্জাম ও ড্রোন ব্যবহার করছেন। ড্রোনের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানোর পাশাপাশি বিপজ্জনক এলাকা আগেভাগে পর্যবেক্ষণ করাও সম্ভব হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোনের ব্যবহার বিশেষ করে নেপালি শেরপা ও অন্যান্য স্থানীয় কর্মীদের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ বিদেশি পর্বতারোহীরা যেখানে কয়েকবার বিপজ্জনক বরফাঞ্চল অতিক্রম করেন, স্থানীয় কর্মীদের সেখানে তাঁবু, অক্সিজেন, খাবারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে একই পথ বারবার পাড়ি দিতে হয়।

সামনে নেপালের পাহাড়ে আবারও পর্যটন ও পর্বতারোহণের মৌসুম শুরু হচ্ছে। শরতের ট্রেকিং মৌসুমকে কেন্দ্র করে অনেক অভিযান ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে। গাইড, পোর্টার, হোটেল ও লজ মালিকরা এই মৌসুমের আয়ের ওপর নির্ভর করছেন। তবে পরিবর্তিত জলবায়ু ও অস্থিতিশীল পাহাড় তাঁদের সামনে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

মার্কিন পর্বতারোহী ডেভ ওয়াটসনের মতে, এভারেস্টের চূড়াতেও বরফের পরিমাণ কমে যাওয়ার ঘটনা পৃথিবীর সামগ্রিক পরিবর্তনের একটি বড় ইঙ্গিত। তাঁর বক্তব্য, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ যদি এতটা বরফ হারায়, তাহলে পৃথিবীর কোনো স্থানই এই পরিবর্তনের বাইরে নেই।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad