মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগদানের আগে জাতীয় স্বার্থ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণের পরামর্শ

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৭ রাত
  • ৬৯৯৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের আগে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমীকরণ সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এ ধরনের প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হলে সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সম্ভাব্য ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রভাবও গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান: কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ এ সভার আয়োজন করে।

সভায় ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সামরিক শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে আন্তকার্যক্ষমতা (ইন্টারঅপারেবিলিটি) গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে।

তবে চুক্তিতে যোগদানের সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশ এ ধরনের একটি প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হলে ভারত তাদের সামরিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে নতুনভাবে বিবেচনা করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান ভবিষ্যতেও অপরিবর্তিত থাকবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।

ফজলে এলাহী আকবর বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগদানের বিষয়ে বাংলাদেশের তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। দীর্ঘদিন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ থাকলেও নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়াবে—এমন নির্ভরযোগ্য মিত্ররাষ্ট্র বাংলাদেশের নেই। এ বাস্তবতায় একটি সমষ্টিগত নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আসা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে বিবেচনার বিষয় হতে পারে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়—এ বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এটি একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট। ভারতের বিরুদ্ধে কোনো চুক্তি হিসেবে এটিকে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি বলেন, এ ধরনের চুক্তি নিজেদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা প্রয়োজন। কোন কোন দেশ এতে যুক্ত হচ্ছে এবং চুক্তিতে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা পরিষ্কারভাবে জেনে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলেই বাংলাদেশের সব প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। জনগণের মধ্যে চুক্তিটির প্রতি সমর্থন থাকলেও ‘হুজুগে হাইপ’ তৈরি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না।

তিনি বলেন, চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি নিয়ে যথাযথ ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ করতে হবে। সরকার এখনো এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জনগণের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার না করে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিনন্দনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, চুক্তিতে যোগদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। এ বিষয়ে সংসদ, রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি।

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনায় এর বিরোধিতাকারীদের কেউ কেউ ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর উদাহরণ টানছেন। তাঁদের যুক্তি, ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আক্রান্ত সদস্যকে সহায়তায় অন্য সদস্যদের প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়।

তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে আর্টিকেল ৫ মূলত কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে সম্মিলিতভাবে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, তার একটি কাঠামো নির্ধারণ করে। এর অর্থ কোনো দেশের ওপর হামলা হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে—এমন নয়।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিজস্ব সামরিক সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক উপপ্রধান জন এফ ড্যানিলোউইজ অনলাইনে আলোচনায় যুক্ত হয়ে বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বিএনপি সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ কী হবে, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হবে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’কে কীভাবে একটি বৃহৎ নীতিগত অবস্থান থেকে বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া যায়, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সেই সুযোগ তৈরি করেছে।

জন এফ ড্যানিলোউইজ বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংবা এতে থাকা তিন দেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো সমস্যা নেই। তবে এ চুক্তির প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়েও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান তিনি।

আলোচনায় প্রতিরক্ষা খাত, সামরিক সক্ষমতা ও জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন।

তিনি বলেন, যেকোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। ভবিষ্যতে দেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে নিজস্ব উদ্যোগে নেওয়া কোনো পদক্ষেপে চুক্তিভুক্ত কোনো দেশ যাতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’-এর সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। আরও বক্তব্য দেন এফএসডিএসের প্রধান গবেষণা ফেলো ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাফায়াত আহমেদ, নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসান নাসির, মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, সাংবাদিক ফয়সাল মাহমুদ, এনসিপি নেত্রী মনিরা শারমিন এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দিন হোসেনসহ অনেকে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad