মস্তিষ্কের ইশারায় চলবে কম্পিউটার, বদলে যেতে পারে প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
একসময় কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করতে কিবোর্ড ও মাউসের প্রয়োজন হতো। পরে টাচস্ক্রিন ও ভয়েস কমান্ড সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে। এবার মানুষের মস্তিষ্কের সংকেত ব্যবহার করে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি নিয়ে এগোচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (বিসিআই) নামের এই প্রযুক্তি মানুষের মস্তিষ্ক ও কম্পিউটারের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

কল্পনা করুন, কম্পিউটারের সামনে বসে কোনো কিবোর্ড বা মাউস ব্যবহার না করেই শুধু মনে মনে একটি বাক্য ভাবলেন, আর সেটি কম্পিউটারের পর্দায় লেখা হয়ে গেল। অথবা কোনো পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তি চিন্তার মাধ্যমে হুইলচেয়ার নিয়ন্ত্রণ করছেন কিংবা রোবোটিক হাত দিয়ে একটি গ্লাস তুলে পানি পান করছেন। কয়েক বছর আগেও এসব বিষয় অনেকটা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও বর্তমানে গবেষণাগারে এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

বিসিআই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো মানুষের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেত। মানুষ যখন কোনো কিছু ভাবে, দেখে বা শরীরের কোনো অঙ্গ নাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে বৈদ্যুতিক সংকেত আদান-প্রদান হয়। বিসিআই প্রযুক্তি এসব সংকেত শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করে কম্পিউটার বোঝে এমন ডিজিটাল নির্দেশনায় রূপান্তর করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে কিবোর্ড বা মাউসের পরিবর্তে মস্তিষ্কের সংকেতই কম্পিউটারের ইনপুট হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

তবে বিসিআই নিয়ে গবেষণা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ করে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত সেন্সর এবং ক্ষুদ্রাকৃতির ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে এই গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানি এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যার মাধ্যমে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিরা চিন্তার সাহায্যে কম্পিউটারে লিখতে বা রোবোটিক বাহু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

চিকিৎসায় সম্ভাবনা বেশি

স্বাস্থ্যসেবায় বিসিআই প্রযুক্তির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা বা রোগের কারণে যারা কথা বলতে কিংবা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না, তাদের জন্য এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

মস্তিষ্কের সংকেত ব্যবহার করে একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তি কম্পিউটারে বার্তা লিখতে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে কিংবা হুইলচেয়ার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন—এমন সম্ভাবনা নিয়েই গবেষণা চলছে। এ কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিসিআইকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক প্রযুক্তিগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বদলে যেতে পারে কম্পিউটার ব্যবহারের ধরন

বিসিআই প্রযুক্তির প্রয়োগ শুধু চিকিৎসাক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রযুক্তিটি সফলভাবে বিকশিত হলে কম্পিউটার ব্যবহারের প্রচলিত পদ্ধতিতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

ই-মেইল লেখা, গেম খেলা, স্মার্ট হোমের বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ কিংবা ভার্চুয়াল রিয়েলিটির অভিজ্ঞতা—এসব কাজ ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের সংকেতের মাধ্যমে করা সম্ভব হতে পারে। এতে প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ আরও স্বাভাবিক ও দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বড় চ্যালেঞ্জ নির্ভুলতা ও গোপনীয়তা

বিসিআই প্রযুক্তির সামনে অবশ্য বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল হওয়ায় প্রতিটি চিন্তা বা অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত বৈদ্যুতিক সংকেত নির্ভুলভাবে শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করা সহজ নয়। ফলে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা ও নির্ভুলতা আরও বাড়ানো এখনো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।

এর পাশাপাশি মস্তিষ্কের তথ্য অত্যন্ত ব্যক্তিগত। এসব তথ্য অননুমোদিতভাবে সংগ্রহ, ব্যবহার বা অপব্যবহার করা হলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বিসিআই প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সুস্পষ্ট নৈতিক নীতিমালার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।

এখনো পুরোপুরি ‘চিন্তা পড়া’ সম্ভব নয়

বিসিআই নিয়ে সবচেয়ে বেশি কৌতূহলের একটি বিষয় হলো—এই প্রযুক্তি কি মানুষের মনের সব চিন্তা পড়ে ফেলতে পারবে?

বর্তমান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এর উত্তর হলো, না। আধুনিক বিসিআই নির্দিষ্ট ধরনের মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ করে কিছু নির্দিষ্ট কাজের নির্দেশ শনাক্ত করতে পারে। তবে মানুষের সব চিন্তা, স্মৃতি কিংবা অনুভূতি পড়ে ফেলার সক্ষমতা এখনো এই প্রযুক্তির নেই।

তবে গবেষণা যত এগোচ্ছে, বিসিআইয়ের সক্ষমতাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থা মানুষের সঙ্গে কম্পিউটারের যোগাযোগ আরও স্বাভাবিক, দ্রুত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে বিসিআই চিকিৎসাক্ষেত্রের পাশাপাশি শিক্ষা, শিল্প, গেমিং এবং দৈনন্দিন প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস শুধু একটি নতুন প্রযুক্তি নয়; এটি মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্কের ধরন বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাময় একটি প্রযুক্তি। টাচস্ক্রিন যেভাবে কম্পিউটার ও স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারে বড় পরিবর্তন এনেছিল, বিসিআই হয়তো ভবিষ্যতে সেই পরিবর্তনকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে। তখন কম্পিউটার পরিচালনার জন্য হাত বা কণ্ঠের বদলে শুধু মস্তিষ্কের সংকেতই যথেষ্ট হয়ে উঠতে পারে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad