তুরস্কের এই নীতির সর্বশেষ দৃষ্টান্ত সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় তিন দেশ চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। এতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।
গত ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে তিন দেশের কর্মকর্তারা চুক্তির আওতায় গঠিত কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। একই সময়ে জোটটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে আসে।
চুক্তিটিকে অনেকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করলেও এর কাঠামো এখনো ন্যাটোর সমতুল্য নয়। পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কোন পরিস্থিতিতে সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে এবং যৌথ কমান্ড ও সামরিক সক্ষমতা কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কাঠামো স্পষ্ট নয়।
তবে কৌশলগত দিক থেকে চুক্তিটির গুরুত্ব রয়েছে। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পদ, তুরস্কের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের বড় সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক সক্ষমতা। ফলে তিন দেশের সক্ষমতা পরস্পরকে সম্পূরক করার সুযোগ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন করে ভাবার প্রবণতাও এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
ন্যাটোর বিকল্প নয়মক্কা চুক্তির মাধ্যমে তুরস্ক ন্যাটো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে আঙ্কারা। তুরস্কের যোগাযোগ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চুক্তিটি ন্যাটোর বিকল্প নয়; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি পরিপূরক ব্যবস্থা। আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব বাড়ানোর অর্থ ন্যাটো সদস্যপদ থেকে সরে যাওয়া নয় বলেও তুরস্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
এতে তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে। কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে আঙ্কারা একই সঙ্গে পশ্চিমা জোট, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে।
এসসিওতেও ঘনিষ্ঠতার উদ্যোগতুরস্কের বহুমুখী কূটনীতির আরেকটি দিক হলো এসসিওর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ। বর্তমানে তুরস্ক সংস্থাটির পূর্ণ সদস্য নয়; দেশটির অবস্থান ডায়ালগ পার্টনারের।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে এসসিও সম্মেলন থেকে ফেরার পথে প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান জানান, তুরস্ক সংস্থাটির পূর্ণ সদস্য হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পূর্বের শক্তিগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মানেই পশ্চিমা জোট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়।
এসসিওর অন্যতম প্রধান শক্তি চীন ও রাশিয়া। ভারত, ইরান ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশও সংস্থাটির সঙ্গে যুক্ত। তুরস্ক ভবিষ্যতে পূর্ণ সদস্যপদের দিকে এগোলে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর পাশাপাশি এশিয়ার বহুপাক্ষিক কাঠামোর সঙ্গেও দেশটির প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে।
ভারসাম্য রক্ষাই বড় চ্যালেঞ্জতবে তুরস্কের এই বহুমুখী কূটনীতিতে ঝুঁকিও রয়েছে। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে দেশটির ওপর পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যদিকে এসসিওর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হলে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা বাড়তে পারে। ফলে দুই ভিন্ন ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা আঙ্কারার জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে এরদোয়ান সরকারের দৃষ্টিতে এই পরিস্থিতি একই সঙ্গে একটি সুযোগও। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, কৃষ্ণসাগর, ককেশাস, মধ্য এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরের সংযোগস্থলে তুরস্কের অবস্থান দেশটিকে বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।
এই ভূরাজনৈতিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে আঙ্কারা নিজেকে শুধু আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। মক্কা চুক্তি এর মধ্যপ্রাচ্যমুখী প্রকাশ, এসসিওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এশিয়ামুখী উদ্যোগ এবং ন্যাটো সদস্যপদ পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখার ভিত্তি।
তুরস্কের লক্ষ্য সম্ভবত কোনো একটি জোট বেছে নেওয়া নয়; বরং একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত পরিসর ও দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো। এই নীতি সফল হলে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায় তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তি হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা কিংবা এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক করিডর—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ অবস্থান তুরস্ককে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা বাড়ানোর সুযোগ দিতে পারে।
তবে এই কৌশলের সাফল্য নির্ভর করবে ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতার ওপর। একই সঙ্গে ন্যাটো, এসসিও, সৌদি আরব, পাকিস্তান, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে কোনো পক্ষের আস্থা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই হবে আঙ্কারার বড় পরীক্ষা।
তাই মক্কা চুক্তি কিংবা এসসিওর দিকে তুরস্কের অগ্রসর হওয়াকে ন্যাটো ত্যাগের প্রস্তুতি হিসেবে দেখার চেয়ে বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যায়। পশ্চিমা নিরাপত্তা জোট, মুসলিম বিশ্বের আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং এশিয়ার উদীয়মান বহুপাক্ষিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে তুরস্ক কতটা স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান তৈরি করতে পারে—আগামী দিনগুলোতে সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক