৬৩ বিদেশির অনলাইন প্রতারণা চক্রে দেশীয় সহযোগী শনাক্ত

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
চট্টগ্রাম নগরের খুলশীতে গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশি নাগরিক একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের সদস্য বলে দাবি করেছে পুলিশ। তাদের সঙ্গে যুক্ত দেশীয় সহযোগীদের কয়েকজনকে ইতিমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে খুলশী থানাধীন কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের একটি আটতলা ভবনে অভিযান চালিয়ে চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের ৬৩ নাগরিককে গ্রেপ্তার করে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা-পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ২০ জন নারী।

নগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ এসব তথ্য জানান।

দেড় মাস ধরে ভাড়া বাসায় কার্যক্রম

পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার বিদেশিরা প্রায় দেড় মাস আগে ওই বাড়িটি ভাড়া নেন। বাড়িটির মালিক একজন দুবাইপ্রবাসী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই বাসা ব্যবহার করেই তারা অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন।

তবে এটিই তাদের একমাত্র আস্তানা ছিল না। এর আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় অবস্থান করে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রতারণা এবং অন্যান্য সাইবার অপরাধ চালিয়ে আসছিলেন তারা।

এখন তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে—দেশের আর কোন কোন এলাকায় তারা অবস্থান করেছেন, কারা তাদের বাসা ভাড়া দিয়েছেন, ভাড়ার চুক্তি কার নামে হয়েছে এবং আগের ঠিকানাগুলোতেও একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল কি না।

দেশীয় সহযোগীদের খুঁজছে পুলিশ

পুলিশের ভাষ্য, বাংলাদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ওই বিদেশিদের দেশীয় ও বিদেশি সহযোগী ছিল। কয়েকজন সহযোগী এখনো পলাতক। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এসব সহযোগীর কয়েকজন চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. শামীম হোসেন বলেন, ৬৩ বিদেশি দীর্ঘ সময় একটি আবাসিক এলাকায় অবস্থান করায় তাদের বাসা ভাড়া, ইন্টারনেট সংযোগ, যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, খাবার ও যাতায়াতসহ নানা ধরনের লজিস্টিক সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে। এসব সহায়তার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তদন্তের স্বার্থে এখন পর্যন্ত সহযোগীদের কারও নাম প্রকাশ করেনি পুলিশ।

উদ্ধার ১৩৪ মোবাইল, ৫৭ ল্যাপটপ

অভিযানে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি অ্যাপল ট্যাব, একটি সিপিইউ, একটি মনিটর, কিবোর্ড, মাউস, প্রিন্টার, পাঁচটি পেনড্রাইভ ও চারটি সিমকার্ড। এছাড়া তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি কম্বোডিয়ান কর্মসংস্থান কার্ড পাওয়া গেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ মিলিয়ে মোট ১৯১টি ডিভাইস উদ্ধার হয়েছে। এসব ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতারণা চক্রের যোগাযোগ, সম্ভাব্য সহযোগী ও অর্থ লেনদেনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছে পুলিশ।

চট্টগ্রামের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বাংলাদেশ সাইবার এক্সপ্রেসের প্রধান নির্বাহী রিদুয়ান হৃদয়ের মতে, ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে কোন ডিভাইস কে ব্যবহার করতেন, কোন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা হয়েছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে এবং আর্থিক লেনদেনের কোনো রেকর্ড রয়েছে কি না—এসব তথ্য বের করা সম্ভব। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পলাতক সহযোগীদের পরিচয়ও পাওয়া যেতে পারে।

নানা কৌশলে চলে অনলাইন প্রতারণা

পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইন প্রতারণায় প্রথমে ব্যবহারকারীর মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করা হয়। এরপর লিংক, ওয়েবসাইট, অ্যাপ কিংবা সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত তথ্য বা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিনিয়োগের বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রথমে অল্প অর্থ জমা দিতে বলা হয়। অ্যাপে কৃত্রিমভাবে লাভ দেখিয়ে কিংবা সামান্য অর্থ ফেরত দিয়ে ব্যবহারকারীর আস্থা তৈরি করা হয়। পরে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। একপর্যায়ে দেখা যায়, অ্যাপে দেখানো লাভের অর্থ বাস্তবে তোলা সম্ভব নয়।

চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেও একই ধরনের প্রতারণা করা হয়। ‘বাড়িতে বসে আয়’, ‘অনলাইনে কাজ’ বা ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানে চাকরি’র প্রলোভন দেখিয়ে নিবন্ধন ফি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য নেওয়া হয়।

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া এবং ভুয়া অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে অর্থ জমা দিতে বলেও প্রতারণা করা হয়। কখনো ব্যাংক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা বা পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে ভয় দেখিয়ে অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

অনলাইন জুয়ার সংশ্লিষ্টতার তথ্য

খুলশীতে গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশি অনলাইন জুয়ার কার্যক্রমের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন—এমন প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ।

পুলিশ জানায়, ক্রিকেট ম্যাচসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে বাজি ধরার সুযোগ দেওয়া হয়। ব্যবহারকারীদের নির্দিষ্ট অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলে অর্থ জমা দিতে বলা হয়। অননুমোদিত এসব অ্যাপে ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য দেওয়ায় তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে।

প্রতারণার অর্থ কোথায় যেত, খতিয়ে দেখছে পুলিশ

পুলিশের মতে, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘবদ্ধভাবে আর্থিক প্রতারণা, জালিয়াতি ও আইনানুগ কর্তৃত্ববহির্ভূত ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।

তবে প্রতারণার অর্থের প্রকৃত গতিপথ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কার্ড কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অর্থ বাংলাদেশে রাখা হতো, নাকি বিদেশে পাচার করা হতো—সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

বড় নেটওয়ার্কের সন্ধানে তদন্ত

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনা শুধু খুলশীর ওই বাড়ি কিংবা গ্রেপ্তার ৬৩ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশিরা এর আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করেছেন এবং তাদের দেশীয় ও বিদেশি সহযোগী ছিল।

কারা তাদের বাংলাদেশে এনেছে, কারা বাসা ভাড়া করে দিয়েছে, কারা লজিস্টিক সহায়তা করেছে, তারা আগে কোথায় অবস্থান করেছে এবং বাংলাদেশের কারা নিয়মিত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ১৩৪টি মোবাইল ফোন ও ৫৭টি ল্যাপটপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এসব ডিভাইস থেকে প্রতারণা চক্রের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, সহযোগী ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছে তদন্তকারীরা।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, দেশীয় যারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত আরও গভীরে নিয়ে গিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad