‘আসসালামু আলাইকুম’ বলার বিতর্কে পশ্চিমবঙ্গে নারী আইপিএস কর্মকর্তার বদলি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৭ দুপুর
  • ৩৮৬২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ইনশাআল্লাহ’ ও ‘জাযাকাল্লাহ’—ইসলামি অভিবাদন ও শব্দ ব্যবহারের একটি ভিডিওকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের এক নারী আইপিএস কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২১ ব্যাচের আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানোকে পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের পদ থেকে সরিয়ে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের চতুর্থ ব্যাটালিয়নের ডেপুটি কমান্ডান্ট করা হয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতর গত ১৪ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে বুশরা বানোসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তার বদলিকে ‘জনস্বার্থে’ নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তারা এটিকে রুটিন বদলি হিসেবে উল্লেখ করলেও বিরোধী দল ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী দাবি করেছেন, বুশরা বানোকে ‘গ্যারেজ পোস্টিং’ দেওয়া হয়েছে—অর্থাৎ আগের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পাঠানো হয়েছে।

যে ভিডিও ঘিরে বিতর্ক

কয়েকদিন আগে বুশরা বানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পর্কে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেনশিয়াল কোচিং একাডেমির সহায়তার কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি সংখ্যালঘু, নারী এবং তফশিলি জাতি ও উপজাতির শিক্ষার্থীদের সহায়তা করে। তিনি নিজেও ওই প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থী।

ভিডিওতে ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ইনশাআল্লাহ’ ও ‘জাযাকাল্লাহ’ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, ইউনিফর্ম পরা একজন সরকারি কর্মকর্তা প্রকাশ্যে এ ধরনের ধর্মীয় অভিব্যক্তি ব্যবহার করতে পারেন কি না। পাশাপাশি ‘জয় হিন্দ’ বা ‘বন্দে মাতরম’ ব্যবহার না করার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, ভিডিওটির সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তবে বুশরা বানোর নিজের সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্ট হিসেবে ভিডিওটির উল্লেখ নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদনে রয়েছে। বর্তমানে তার সামাজিকমাধ্যমে ভিডিওটি পাওয়া যাচ্ছে না।

অভিযোগের পরদিনই বদলি

‘হিন্দু লিগ্যাল ফান্ড’ নামে একটি সংগঠন ১৩ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে বুশরা বানোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কথা সামাজিকমাধ্যমে জানায়। সংগঠনটি অভিযোগ করে, তিনি বক্তব্যের শুরুতে ‘আসসালামু আলাইকুম’, বক্তব্যে ‘ইনশাআল্লাহ’ এবং শেষে ‘জাযাকাল্লাহ’ ব্যবহার করেছেন; কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’ বা ‘জয় হিন্দ’ বলেননি।

সংগঠনটির দাবি ছিল, ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী একজন কর্মরত কর্মকর্তার প্রকাশ্য যোগাযোগে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা উচিত এবং জাতীয় ভাবনার প্রতিফলন ঘটে—এমন শব্দ ব্যবহার করা উচিত।

এর পরদিন, ১৪ সেপ্টেম্বর, বুশরা বানোর বদলির সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়। অভিযোগ এবং বদলির মধ্যে এক দিনের ব্যবধান থাকায় দুটির মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, এ ধরনের রদবদল প্রশাসনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং যেকোনো সময় করা হতে পারে। বদলির সঙ্গে সাম্প্রতিক বিতর্কের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।

বিরোধীদের প্রশ্ন

বুশরা বানোর বদলি নিয়ে বিভিন্ন মুসলিম গোষ্ঠী ও বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও প্রশ্ন তুলেছেন।

ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীর দাবি, বুশরা বানো শুধু তিনটি এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন, যেগুলো অন্য ধর্মের মানুষের জন্য আঘাতের কারণ হওয়ার কথা নয় এবং এগুলো দেশবিরোধীও নয়।

এআইএমআইএমের মুখপাত্র ও সাবেক বিধায়ক ওয়ারিশ পাঠানও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্য, একজন মুসলিম ও নারী আইপিএস কর্মকর্তা হওয়ার কারণে তাকে বদলি করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের পূজা-অর্চনায় অংশ নেওয়া বা কাঁওয়াড়িয়াদের ওপর ফুল ছিটানোর উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্রও সামাজিকমাধ্যমে বুশরা বানোর বদলি নিয়ে সমালোচনা করেছেন।

ইউনিফর্মে ধর্মীয় অভিবাদন নিয়ে কী বললেন সাবেক আইপিএস

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস কর্মকর্তা জগমোহন ভাট বিবিসিকে বলেন, তার দীর্ঘ কর্মজীবনে ইউনিফর্ম পরা কর্মকর্তাদের মুখে ‘জয় হিন্দ’ ছাড়া অন্য কোনো অভিবাদন তিনি শোনেননি।

তার মতে, রাজ্য পুলিশ, সেনাবাহিনী কিংবা সীমান্তরক্ষী বাহিনী—রাষ্ট্রীয় বাহিনীতে ইউনিফর্ম পরা কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘জয় হিন্দ’ প্রচলিত অভিবাদন। কর্মরত অবস্থায় ধর্মীয় বক্তব্য, প্রতীক বা পতাকা এড়িয়ে চলার বিষয়েও তারা সতর্ক থাকতেন বলে জানান তিনি।

কে এই বুশরা বানো?

বুশরা বানোর লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। পুলিশ প্রশাসনে যোগ দেওয়ার আগে তিনি উত্তরপ্রদেশ সরকারের ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ভারতের ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (ইউপিএসসি) সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় দুইবার উত্তীর্ণ হয়েছেন। প্রথমবার উত্তীর্ণ হয়ে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ট্র্যাফিক সার্ভিসে যোগ দেন। দ্বিতীয়বার উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশে যোগ দেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা, নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও সংশ্লিষ্ট সামাজিকমাধ্যমের পোস্ট।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad