দলবদ্ধ জনতার মধ্যে ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও বিচারবোধ অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। মনস্তত্ত্বে এ প্রবণতাকে ‘ডি-ইন্ডিভিজুয়েশন’ বলা হয়। ফলে ক্ষোভ ও আবেগের বশে কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা প্রকৃত অর্থে বিচার নয়; বরং তা সংঘবদ্ধ সহিংসতায় পরিণত হয়।
মানবজীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বইসলাম মানবজীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি হত্যার অপরাধ কিংবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করে, তবে সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল।’
অতএব কোনো ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে জনতার হাতে পিটিয়ে হত্যা করা ইসলামের ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তার বিচার নির্ধারিত আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে হতে হবে।
গুজবের ভিত্তিতে শাস্তি নয়মব জাস্টিসের অন্যতম বড় কারণ হলো যাচাই না করা তথ্য ও গুজব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কোনো খবরের সত্যতা যাচাই না করেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে নির্দোষ ব্যক্তিও জনরোষের শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ইসলাম সংবাদ যাচাইয়ের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। সুরা আল-হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তা যাচাই করে নিতে হবে, যাতে অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে পরে অনুতপ্ত হতে না হয়।
এই নির্দেশনা থেকে স্পষ্ট, কোনো অভিযোগ বা গুজবের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে কারও বিরুদ্ধে সহিংস হয়ে ওঠার সুযোগ ইসলামে নেই। বরং সত্যতা যাচাই ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই কর্তব্য।
বিচার ও শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার কর্তৃপক্ষেরসভ্য সমাজে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নির্দিষ্ট আইন ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত। ইসলামি বিচারব্যবস্থাতেও অভিযোগ, বিচার ও শাস্তি কার্যকরের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণের গুরুত্ব রয়েছে।
ইসলামি ইতিহাসে খলিফা আলী (রা.)-এর বিচারসংক্রান্ত একটি ঘটনা এ ক্ষেত্রে প্রায়ই উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি কাজি শুরাইহের আদালতে একজন সাধারণ নাগরিকের মতো উপস্থিত হয়েছিলেন এবং পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় তাঁর দাবির পক্ষে রায় দেওয়া হয়নি। ঘটনাটি আইনের সামনে জবাবদিহি ও প্রমাণের গুরুত্বের একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত।
অন্যদিকে মব জাস্টিসে অভিযোগকারী, বিচারক ও শাস্তি কার্যকরকারী একই জনতা হয়ে যায়। কোনো ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করার পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, রায় এবং শাস্তি—সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়। এ ধরনের প্রক্রিয়া ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
আইনের শাসনই সমাধানের পথমব জাস্টিস প্রতিরোধে সমাজে নৈতিক দায়িত্ববোধ বাড়ানোর পাশাপাশি আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলে সাধারণ মানুষের দায়িত্ব হলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া; নিজের হাতে শাস্তি কার্যকর করা নয়।
গুজব বা উত্তেজনাকর কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লে তা যাচাই না করে প্রতিক্রিয়া দেখানো থেকেও বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা তৈরি করা জরুরি।
মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শুধু আইন মানার বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রতি দায়িত্বেরও অংশ। উন্মত্ত জনতার সঙ্গে সহিংসতায় যুক্ত হওয়া কোনো ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ নয়। বরং অন্যায়ভাবে কারও ওপর হামলা ঠেকানো, একটি প্রাণ রক্ষা করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখা—এটাই দায়িত্বশীল নাগরিকের ভূমিকা।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন—সুরা আল-মায়িদা, আয়াত ৩২; সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত ৬; ইসলামি বিচারব্যবস্থার ঐতিহাসিক বর্ণনা।

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)