শিয়ালের মাংস, তক্ষক ও জোঁকের তেল—রোগ সারানোর দাবি কতটা সত্য

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২২ দুপুর
  • ৫২৩৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক হাঁপানি থেকে যৌনক্ষমতা বাড়ানো পর্যন্ত নানা রোগের ওষুধ, আর জোঁকের তেল বাত-ব্যথাসহ বিভিন্ন রোগ সারায়—বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন লোকবিশ্বাস দীর্ঘদিনের। এসব বিশ্বাসকে ঘিরে শিয়াল হত্যা, তক্ষক পাচার এবং কথিত ঔষধি পণ্যের বেচাকেনাও চলে আসছে।

বিশেষ করে তক্ষকের ঔষধি গুণ নিয়ে প্রচলিত ধারণার কারণে একসময় বাংলাদেশ থেকে চীন, তাইওয়ান, ভিয়েতনামসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তক্ষক পাচারের ঘটনা ঘটেছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে দেশে তক্ষকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

অন্যদিকে, বিভিন্ন এলাকায় এখনো ‘জোঁকের তেল’ নামে নানা পণ্য বিক্রি হয়। বিক্রেতাদের দাবি, এসব তেল বাত, জয়েন্টের ব্যথা ও কোমরব্যথাসহ বিভিন্ন রোগে কার্যকর। শিয়ালের মাংস নিয়েও রয়েছে একই ধরনের বিশ্বাস।

কিন্তু এসব দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা? শিয়াল, তক্ষক বা জোঁকের দেহ থেকে তৈরি কোনো উপাদান সত্যিই রোগ সারাতে পারে কি না—তা নিয়ে চিকিৎসক, ফার্মাকোলজিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতা।

শিয়ালের মাংসে রোগ সারার প্রমাণ নেই

খেঁকশিয়াল কিংবা পাতিশিয়াল—বাংলাদেশে শিয়াল হত্যার ঘটনা বিভিন্ন সময় ঘটছে। এর পেছনে রয়েছে নানা লোকবিশ্বাস ও ভুল ধারণা। অনেকের ধারণা, শিয়াল অশুভ, ধূর্ত ও ক্ষতিকর প্রাণী। গ্রামাঞ্চলে হাঁস-মুরগি বা গবাদিপশু নিয়ে যাওয়ার অভিযোগেও শিয়াল হত্যা করা হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বলেন, খেঁকশিয়াল সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। কৃষকেরা খেঁকশিয়াল মুরগি খেয়ে ফেলে মনে করলেও তাদের গবেষণায় এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। খুব বিরল ক্ষেত্রে এমনটা হতে পারে।

তার ভাষ্য, পাতিশিয়াল আকারে বড় হওয়ায় তুলনামূলক বড় শিকার ধরতে পারে। ফলে গৃহপালিত হাঁস-মুরগির ওপর আক্রমণের অভিযোগও এর বিরুদ্ধেই বেশি শোনা যায়।

রাতের বেলা শিয়ালের ডাককে অনেক এলাকায় অমঙ্গলের লক্ষণ মনে করা হলেও এরও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

শিয়ালের মাংসের ঔষধি গুণ নিয়েও রয়েছে প্রচলিত বিশ্বাস। অনেকে মনে করেন, এটি খেলে হাঁপানি, বাতসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ ভালো হয়। তবে এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

সম্প্রতি বরিশালে সাতটি শিয়াল পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটে। স্থানীয়দের কেউ কেউ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, শিয়ালের মাংস খেলে বিভিন্ন রোগ ভালো হয়—এমন বিশ্বাস থেকেই রাতে শিয়ালের মাংস রান্না করে রুটি-পিঠার সঙ্গে খেয়েছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, শিয়ালের মাংসে কোনো ঔষধি গুণ নেই। এটি খেলে অসুস্থতা ভালো হয়—এমন ধারণা ভ্রান্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও বলেন, শিয়ালের মাংস খেলে রোগ ভালো হয়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আধুনিক ফার্মাকোলজিতেও এমন তথ্য পাওয়া যায় না। তার মতে, এসব মূলত কুসংস্কার ও লোকবিশ্বাস।

হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের আয়ুর্বেদিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদও জানান, শিয়ালের মাংসের ঔষধি গুণ নিয়ে তাদের কাছে কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই।

তক্ষকের কোটি টাকার গল্প

তক্ষককে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে কোটি টাকায় বিক্রির নানা গল্প ও প্রতারণার ঘটনা সামনে এসেছে। ক্যানসারসহ দুরারোগ্য রোগ সারানো কিংবা যৌনক্ষমতা বাড়ানোর কথিত ঔষধি গুণের কথা বলে কখনো কখনো তক্ষকের দাম কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে। সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

তবে এসব দাবির নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তক্ষকের এমন কোনো বৈধ বাজারমূল্যের তথ্যও নেই।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব গুজবকে কেন্দ্র করে প্রতারণার পাশাপাশি তক্ষক ধরার প্রবণতা বেড়েছে। ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে তক্ষক ব্যবহারের বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে চীন, তাইওয়ান, ভিয়েতনামসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে এটি পাচার হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, তক্ষককে ঘিরে একটি গুজবের দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। গত সাত-আট বছর ধরে এটি চলছে। আগে মানুষ অনেক বেশি তক্ষক ধরত, এখন তা কিছুটা কমেছে। মানুষের একটি অংশ বুঝতে পেরেছে যে তাদের বোকা বানানো হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত বলেন, কোথাও কোথাও হয়তো তক্ষক খাওয়া হয়। এ কারণেই হয়তো ইচ্ছা করে এর দাম বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

জোঁকের চিকিৎসা আছে, কিন্তু জোঁকের তেল?

শিয়ালের মাংস ও তক্ষকের ঔষধি গুণের পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকলেও জোঁক দিয়ে চিকিৎসার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইউনানি চিকিৎসায় জোঁক ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে।

ইউনানি চিকিৎসায় জীবন্ত জোঁক ব্যবহার করে শরীর থেকে রক্ত বা তরল অপসারণের একটি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের আয়ুর্বেদিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদ জানান, শরীরের কোনো স্থানে রক্ত জমাট বাঁধলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এক্সটার্নাল লিচ থেরাপির মাধ্যমে তা অপসারণ করা হয়।

তবে এ চিকিৎসায় নির্দিষ্ট ধরনের জোঁক প্রয়োজন। সব ধরনের জোঁক দিয়ে চিকিৎসা করা হয় না। ‘মেডিকেটেড’ জোঁক ব্যবহার করা হয় এবং এগুলো চাষও করা হয়। ভারত থেকে আনার পাশাপাশি বাংলাদেশেও জোঁক চাষের উদ্যোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।

তার মতে, লিচ থেরাপি শরীরের বিভিন্ন ব্যথা, ডায়াবেটিসজনিত পায়ের ক্ষত বা ডায়াবেটিক ফুট আলসার এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্রণের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে ‘জোঁকের তেল’ নিয়ে প্রচলিত দাবির বিষয়টি আলাদা। বিভিন্ন স্থানে এই তেল বাত, ব্যথা, যৌনসমস্যাসহ নানা রোগের চিকিৎসায় কার্যকর বলে প্রচার করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত বলেন, কবিরাজেরা জোঁকের তেল বিক্রি করেন। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সাপের বিষ, মাছের তেল বা মৌমাছির হুল থেকে ওষুধ তৈরি হতে পারে। বিদেশেও কিছু প্রাণীর বিষ থেকে ওষুধ তৈরি হয়। কিন্তু জোঁকের তেলের কোনো ঔষধি গুণাগুণের প্রমাণ নেই।

সংরক্ষিত প্রাণী শিকার-বেচাকেনা নিষিদ্ধ

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা বিস্তৃত হলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের ফুটপাত ও গ্রামের হাটবাজারে জোঁকের তেল দিয়ে চিকিৎসার প্রচার দেখা যায়। তবে এ ধরনের চিকিৎসা নিয়ে প্রকাশ্যে ক্যানভাসিং করা আইনসম্মত নয়।

শিয়াল ও তক্ষকের ক্ষেত্রেও রয়েছে আইনি সুরক্ষা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad