ব্যাংকার ইশতিয়াকের একাঙ্গি চাষে নতুন সম্ভাবনা, চার বিঘায় ১৫ লাখ আয়ের আশা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১১ দুপুর
  • ২৯৮০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
চাকরির পাশাপাশি কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধান পেয়েছেন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চৌগাছা গ্রামের ইশতিয়াক হাসান। একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা হয়েও কৃষির প্রতি আগ্রহ থেকে বিদেশি মসলা জাতীয় ফসল একাঙ্গি চাষ শুরু করেন তিনি। প্রথমবার এক বিঘা জমিতে সফলতার পর এবার চার বিঘা জমিতে আবাদ করেছেন। ফলন ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আয় করার আশা করছেন তিনি।

বাংলাদেশে একাঙ্গি ‘ভুঁই চম্পা’ বা ‘সুরভি আদা’ নামেও পরিচিত। কোথাও এটি ‘এপি একাঙ্গি’ বা ‘একানি’ নামেও পরিচিত। ফসলটির উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ চীন অথবা ভারত বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাষ হয়ে থাকে।

এক বিঘা থেকে চার বিঘায়

ইশতিয়াক হাসান জানান, কৃষির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও কৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকার ইচ্ছা থেকেই প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি তুলনামূলক লাভজনক নতুন ফসল চাষের উদ্যোগ নেন। প্রথম বছর পরীক্ষামূলকভাবে এক বিঘা জমিতে একাঙ্গি চাষ করেন। নতুন ফসল হওয়ায় শুরুতে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও ভালো ফলন এবং কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি করতে পেরে তিনি লাভবান হন।

সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবার আবাদ বাড়িয়ে চার বিঘা জমিতে একাঙ্গি চাষ করেছেন তিনি।

ইশতিয়াকের ভাষ্য, অন্যান্য অনেক ফসলে উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ আশানুরূপ না হলেও একাঙ্গিতে তুলনামূলক ভালো লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম বছর ভালো ফলন পাওয়ায় এবার তিনি জমির পরিমাণ বাড়িয়েছেন।

ফলন ও বাজারদরে লাভের আশা

ইশতিয়াকের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মণ একাঙ্গি উৎপাদন হতে পারে। প্রকারভেদে বাজারে প্রতি মণ একাঙ্গি ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। উৎপাদন খরচ বাদ দেওয়ার পরও এ ফসলে কৃষকের ভালো লাভের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে শুধু নিজের লাভের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই ইশতিয়াকের পরিকল্পনা। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সার ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে মেহেরপুরে একাঙ্গির আবাদ আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

সফলতা দেখে আগ্রহী অন্য কৃষকেরাও

ইশতিয়াকের জমির পাশেই এবার একাঙ্গি চাষ করেছেন কৃষক কিরন হোসেন। আগে তিনি বিভিন্ন প্রচলিত ফসল চাষ করতেন। ইশতিয়াকের জমির ফলন ও বাজারদর দেখে আগ্রহী হয়ে এবার দেড় বিঘা জমিতে একাঙ্গি চাষ করেছেন। ফলন ও দাম ভালো পেলে আগামী বছর কয়েকগুণ বেশি জমিতে আবাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

একইভাবে কৃষক মিঠু হোসেনও পরীক্ষামূলকভাবে একাঙ্গি চাষ শুরু করেছেন। তিনি জানান, নতুন ফসল হওয়ায় প্রথমে কিছুটা শঙ্কা ছিল। তবে ইশতিয়াকের জমিতে ভালো ফলন দেখে তাঁর আগ্রহ বেড়েছে। কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেলে আগামী মৌসুমে আরও জমিতে এ ফসল চাষ করতে চান তিনি।

কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, ধান, গম, ভুট্টা, আলু ও পেঁয়াজের মতো প্রচলিত ফসলে অনেক সময় উৎপাদন খরচ অনুযায়ী লাভ পাওয়া যায় না। নতুন ও লাভজনক ফসল সম্পর্কে কৃষকদের ধারণা দেওয়া হলে তাঁরা বিকল্প ফসলে আগ্রহী হতে পারেন। একাঙ্গির বাজার স্থিতিশীল থাকলে এটি কৃষকদের জন্য সম্ভাবনাময় বিকল্প হতে পারে।

কৃষক রফিকুল ইসলামও আগামী মৌসুমে একাঙ্গি চাষের কথা ভাবছেন। তাঁর মতে, ব্যাংকের চাকরির পাশাপাশি ইশতিয়াকের কৃষিকাজে যুক্ত থাকা এবং তাঁর জমিতে ভালো ফলন পাওয়া স্থানীয় কৃষকদের উৎসাহিত করছে।

আবাদ বেড়েছে, প্রয়োজন বাজার নিশ্চয়তা

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একাঙ্গি তুলনামূলক নতুন ফসল হওয়ায় এর চাষপদ্ধতি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা এবং বাজারজাতকরণ সম্পর্কে অনেকেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই। তাই কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা চান তাঁরা।

মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাজী শাহনেয়াজ জানান, জেলায় বর্তমানে প্রায় ১১ হেক্টর জমিতে একাঙ্গির আবাদ হয়েছে। নতুন এই ফসলের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। আগ্রহী কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, নতুন কোনো ফসল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শুধু ভালো উৎপাদনই যথেষ্ট নয়; বাজারজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদনের পর কৃষক যাতে ন্যায্য দামে ফসল বিক্রি করতে পারেন, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

কাজী শাহনেয়াজ আরও বলেন, একই ধরনের প্রচলিত ফসলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষিতে বৈচিত্র্য আনা গেলে কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নতুন ফসলের আবাদ বাড়ানোর আগে বাজারের চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, ফলন, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বিক্রির নিশ্চয়তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

চৌগাছা গ্রামের ইশতিয়াক হাসানের উদ্যোগ মেহেরপুরে কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার সম্ভাবনার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। চার বিঘা জমির একাঙ্গিতে কাঙ্ক্ষিত ফলন ও ভালো বাজারদর পেলে তাঁর প্রায় ১৫ লাখ টাকা আয়ের লক্ষ্য পূরণ হতে পারে। তাঁর সাফল্য অনুসরণ করে অন্য কৃষকেরাও এ ফসলে যুক্ত হলে মেহেরপুরের কৃষিতে একাঙ্গি নতুন সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে।

তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ২৪, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad