জুয়া— ইহকাল ও পরকালের ধ্বংসের ফাঁদ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৭ বিকাল
  • ৪৭১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা কিংবা রাতারাতি অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক মানুষকে জুয়ার মতো সর্বনাশা পথে ঠেলে দেয়। বাইরে থেকে এটি সাময়িক বিনোদন বা দ্রুত অর্থ লাভের সুযোগ মনে হলেও এর পরিণতি হতে পারে ব্যক্তিগত নিঃস্বতা, পারিবারিক অশান্তি ও সামাজিক অবক্ষয়। ইসলামি শরিয়তে জুয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কোরআন-হাদিসে এর ক্ষতিকর দিক এবং ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।কোরআনে জুয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ

পবিত্র কোরআনে মদ ও জুয়ার ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَسْـَلُوْنَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِۗ قُلْ فِيْهِمَا اِثْمٌ كَبِيْرٌ وَّمَنَافِعُ لِلنَّاسِࣗ وَاِثْمُهُمَا اَكْبَرُ مِنْ نَّفْعِهِمَاۗ

‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলে দিন, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারিতাও রয়েছে; তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২১৯)

পরবর্তী সময়ে জুয়া ও মদকে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে তা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ الْخَمْرَ وَالْمَيْسِرَ وَالْأَنْصَابَ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

‘হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক তিরসমূহ—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া অন্য কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত ৯০)

জুয়ার প্রস্তাবও নিরুৎসাহিত

জুয়া খেলার পাশাপাশি এর প্রতি উৎসাহ বা প্ররোচনাকেও ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ قَالَ لِصَاحِبِهِ: تَعَالَ أُقَامِرْكَ، فَلْيَتَصَدَّقْ

‘যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলে, এসো তোমার সঙ্গে জুয়া খেলি, সে যেন দান-খয়রাত করে।’ (বুখারি, ৬৩০১)

অর্থাৎ, নিছক কথার ছলেও জুয়ার প্রস্তাব দেওয়াকে হাদিসে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

জুয়ার ভয়াবহতা বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) জুয়া খেলাকে অত্যন্ত নিকৃষ্ট কাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এ বিষয়ে আদাবুল মুফরাদ-এও হাদিস বর্ণিত হয়েছে (১২৮৯)।

জুয়ার বহুমুখী ক্ষতি

ইসলামের সূচনালগ্নের আরব সমাজে মোরগের লড়াই, কবুতর ওড়ানো, উটের খেলা কিংবা পাশা খেলায় বাজির প্রচলন ছিল। আধুনিক সময়ে প্রযুক্তির প্রসারের ফলে জুয়া আরও সহজলভ্য হয়েছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসেই বিভিন্ন ধরনের অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

জুয়ার অন্যতম বড় ক্ষতি হলো অবৈধভাবে অন্যের সম্পদ ভোগ করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡكُلُوۡۤا اَمۡوَالَكُمۡ بَیۡنَكُمۡ بِالۡبَاطِلِ اِلَّاۤ اَنۡ تَكُوۡنَ تِجَارَۃً عَنۡ تَرَاضٍ مِّنۡكُمۡ

‘হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা নিসা, আয়াত ২৯)

জুয়ার মাধ্যমে অর্থ হারানোর পাশাপাশি মানুষের মধ্যে লোভ, হতাশা ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। সর্বস্ব হারানোর পর অনেকে ঋণের বোঝায় জড়িয়ে পড়েন। এর প্রভাব পরিবারেও পড়ে এবং পারিবারিক কলহ ও সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।

আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরায়

কোরআনে জুয়ার আরেকটি ক্ষতিকর দিক হিসেবে মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

اِنَّمَا یُرِیۡدُ الشَّیۡطٰنُ اَنۡ یُّوۡقِعَ بَیۡنَكُمُ الۡعَدَاوَۃَ وَ الۡبَغۡضَآءَ فِی الۡخَمۡرِ وَ الۡمَیۡسِرِ وَ یَصُدَّكُمۡ عَنۡ ذِكۡرِ اللّٰهِ وَ عَنِ الصَّلٰوۃِ ۚ فَهَلۡ اَنۡتُمۡ مُّنۡتَهُوۡنَ

‘শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর চায় আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। অতএব, তোমরা কি বিরত হবে না?’ (সুরা মায়িদা, আয়াত ৯১)

এ ছাড়া হালাল ও পবিত্র উপার্জনের গুরুত্বও ইসলামে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لاَ يَقْبَلُ إِلاَّ طَيِّبًا

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (মুসলিম, ২২৩৬)

ব্যক্তি থেকে সমাজ—ক্ষতি বহুমাত্রিক

জুয়ার নেশা ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি সামাজিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা দুর্নীতির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘদিনের জুয়াসক্তি মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে পারিবারিক সম্পর্কেও সংকট তৈরি করতে পারে।

তাই জুয়াকে নিছক বিনোদন বা দ্রুত অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইসলামি দৃষ্টিতে এটি নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে জুয়া থেকে বিরত থাকা এবং তরুণদের মধ্যে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জোরদার করা জরুরি।

লেখক: ইসলামিক স্কলার, মুফাসসিরে কোরআন ও পীরসাহেব, শাজুলিয়া দরবার শরিফ।

তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারা ২১৯, সুরা মায়িদা ৯০–৯১, সুরা নিসা ২৯; সহিহ বুখারি ৬৩০১; সহিহ মুসলিম ২২৩৬; আদাবুল মুফরাদ ১২৮৯।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad