পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া মানেই একজন শিক্ষার্থী মেধাহীন বা ভবিষ্যতে সফল হওয়ার অযোগ্য—এমন নয়। বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা, অনিয়মিত উপস্থিতি, পারিবারিক আর্থিক সংকট, অসুস্থতা, পরীক্ষাভীতি কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের সীমাবদ্ধতা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য একক কোনো ব্যবস্থা কার্যকর হবে না। কারও এক বা দুটি বিষয়ে সামান্য ঘাটতি থাকতে পারে, আবার কারও একাধিক বিষয়ে মৌলিক ধারণা দুর্বল হতে পারে। শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য।
শুধু পুনঃপরীক্ষা নয়, প্রয়োজন পরিকল্পিত পাঠদানএসএসসির ফল প্রকাশের পর তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা কমতে পারে। তবে এ সময়ের মধ্যে তাদের নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক পাঠদান, দুর্বল অধ্যায়ে অনুশীলন এবং শিক্ষকের পরামর্শ নিশ্চিত করা না গেলে উদ্যোগটির কার্যকারিতা সীমিত থাকবে।
যে শিক্ষার্থী গণিতের বীজগণিত বুঝতে পারেনি, ইংরেজিতে বাক্য গঠনে দুর্বল কিংবা বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা আয়ত্ত করতে পারেনি, তার সমস্যার সমাধান শুধু নতুন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণায় হবে না। প্রয়োজন দুর্বলতা শনাক্ত করে পরিকল্পিতভাবে শেখানো এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে অগ্রগতি যাচাই করা।
এ জন্য প্রতিকারমূলক শিক্ষা বা রেমেডিয়াল এডুকেশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এর আওতায় ছোট দলে পাঠদান, অতিরিক্ত অনুশীলন, নিয়মিত ছোট পরীক্ষা, ব্যক্তিগত পরামর্শ এবং শিক্ষার্থীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। প্রয়োজনে ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ ও সহপাঠীভিত্তিক শেখার সুযোগও দেওয়া যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাবিভিন্ন দেশে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি পূরণে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে (সিবিএসই) নির্দিষ্ট শর্তে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সম্পূরক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও স্কুল ডিস্ট্রিক্টে সামার স্কুল, অতিরিক্ত পাঠদান এবং প্রয়োজনীয় কোর্স পুনরায় সম্পন্ন করার ব্যবস্থা চালু আছে। কানাডার অন্টারিওতে রয়েছে ক্রেডিট পুনরুদ্ধার ও সামার স্কুলের সুযোগ। ফ্রান্সের ব্যাকালরেয়া পরীক্ষায়ও নির্দিষ্ট শর্তে মৌখিক মূল্যায়নের মাধ্যমে ফল উন্নত করার ব্যবস্থা রয়েছে।
এসব দেশের পদ্ধতি এক নয়। তবে অভিন্ন লক্ষ্য হলো—শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এসব অভিজ্ঞতার কার্যকর দিক বিবেচনায় নিয়ে উপযোগী ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
শিক্ষার্থীর দুর্বলতা অনুযায়ী পৃথক ব্যবস্থাযেসব শিক্ষার্থী এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের জন্য বিষয়ভিত্তিক পুনঃপরীক্ষা ও অতিরিক্ত ক্লাস যথেষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে, একাধিক বিষয়ে গভীর দুর্বলতা থাকলে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও নিয়মিত মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে।
কোনো শিক্ষার্থীকে এক বছর পিছিয়ে দেওয়া যেমন সব ক্ষেত্রে কার্যকর সমাধান নয়, তেমনি প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন ছাড়াই পরবর্তী শিক্ষাস্তরে তুলে দেওয়াও যুক্তিসংগত নয়। তাই শিক্ষার্থীর শিখনঘাটতির মাত্রা, পারিবারিক অবস্থা এবং পরবর্তী শিক্ষাস্তরের প্রস্তুতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে শিক্ষার্থীরা হতাশা, আর্থিক সংকট কিংবা কর্মজীবনে প্রবেশের চাপে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে পারে। এ ঝুঁকি কমাতে পুনঃপরীক্ষার সুযোগের পাশাপাশি প্রয়োজনভিত্তিক পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরিকার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রথমে ফলাফল ও ধারাবাহিক মূল্যায়নের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিষয়ভিত্তিক শিখনঘাটতি শনাক্ত করতে হবে। এরপর শিক্ষার্থীর দুর্বলতা অনুযায়ী পাঠপরিকল্পনা তৈরি, অতিরিক্ত ক্লাস, নিয়মিত অনুশীলন এবং অগ্রগতি যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে শিক্ষা উপকরণ, প্রয়োজনীয় যাতায়াত সহায়তা ও পরামর্শসেবা দেওয়া জরুরি। কোনো শিক্ষার্থী যেন দারিদ্র্য বা পারিবারিক সংকটের কারণে শিক্ষার বাইরে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রতিকারমূলক শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক, অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের পাঠপরিকল্পনা, উপস্থিতি, মূল্যায়ন ও অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে।
চতুর্থত, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মানসম্মত সুযোগ বাড়াতে হবে। এসব শিক্ষাপথকে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য নিম্নমানের বিকল্প হিসেবে না দেখে মর্যাদাপূর্ণ ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, নির্বাচিত কিছু অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে কর্মসূচি চালু করে এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা যেতে পারে। কতজন শিক্ষার্থী নিয়মিত অংশ নিয়েছে, কতজনের শিখনঘাটতি পূরণ হয়েছে, কতজন পুনঃপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে এবং পরবর্তী শিক্ষাস্তরে কতজন টিকে রয়েছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে কর্মসূচি সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
শিক্ষার লক্ষ্য হোক প্রকৃত দক্ষতা অর্জনঅকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া মানবিক দায়িত্ব। কিন্তু প্রয়োজনীয় পাঠদান ছাড়া শুধু দ্বিতীয়বার পরীক্ষার হলে পাঠানো পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি হতে পারে না। একইভাবে, যথাযথ সহায়তা ছাড়াই একজন শিক্ষার্থীকে এক বছর পিছিয়ে দেওয়াও দূরদর্শী সমাধান নয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু পরীক্ষা আয়োজন বা ফল প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীর দুর্বলতা শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় পাঠদান নিশ্চিত করা এবং শিখনঘাটতি পূরণের বাস্তব সুযোগ তৈরি করাও শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
পাবলিক পরীক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে দ্রুত পাস করানো নয়; বরং তাকে এমনভাবে শেখানো, যাতে সে পরবর্তী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারে। কারণ পরীক্ষায় পাস করা সাফল্যের একটি ধাপ, আর শেখার সক্ষমতা অর্জনই ভবিষ্যৎ গড়ার ভিত্তি।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক