কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মৃত দর্পণ নারায়ণের বাড়ির উঠানের পাশে গাছটির অবস্থান। বিশাল কাণ্ড, বিস্তৃত শাখা-প্রশাখা ও সারা বছর সবুজ পাতায় ঘেরা বৃক্ষটি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। স্থানীয় প্রবীণদের ধারণা, গাছটির বয়স অন্তত ৫০০ বছর। ব্রিটিশ আমল থেকেই এটি ‘অচিন গাছ’ নামে পরিচিত।
পরিচয় নিয়ে নানা লোককথাগাছটির উৎপত্তি নিয়ে এলাকায় প্রচলিত রয়েছে নানা কাহিনি। কেউ বলেন, ভারতের কামরূপ-কামাখ্যা থেকে জাদুকরেরা গাছটি উড়িয়ে এনেছিলেন। আবার কারও বিশ্বাস, কোনো এক অজানা পীর পশ্চিম দিক থেকে এর চারা এনে রোপণ করেছিলেন। এসব গল্পের সত্যতা অবশ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সবচেয়ে প্রচলিত জনশ্রুতিগুলোর একটি মংলু রামকে ঘিরে। কথিত আছে, ভারতের কলতাপাড়া এলাকায় কাজ করার সময় এক বৃদ্ধার নাতনিকে বিয়ে করেন মংলু রাম। পরে ওই বৃদ্ধা তাঁদের বাড়ি ফেরার জন্য একটি গাছ উপহার দেন। লোককথা অনুযায়ী, সেই গাছের ডালে তাঁদের বেঁধে দিলে রাতের আঁধারে গাছটি তাঁদের নিয়ে মংলু রামের বাড়িতে পৌঁছে যায়। সকালে গ্রামবাসী বিশাল গাছটি দেখে বিস্মিত হন। গাছটির পরিচয় জানা না থাকায় তাঁরা এর নাম দেন ‘অচিন গাছ’। এই নাম থেকেই পরে এলাকার নামকরণ হয়েছে বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।
বৈজ্ঞানিক পরিচয় শনাক্তের দাবিদীর্ঘদিন ধরে গাছটির পরিচয় অনুসন্ধান করেছেন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক ও সাবেক অধ্যক্ষ এবং কুড়িগ্রাম সিটি কলেজের অধ্যক্ষ মীর্জা মো. নাসির উদ্দিন। নমুনা সংগ্রহ ও কয়েক বছরের অনুসন্ধানের পর তিনি গাছটির বৈজ্ঞানিক পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছেন বলে দাবি করেছেন।
মীর্জা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘গাছটি মরীচি পরিবারের ফিকাস গণভুক্ত।’
গাছটির পাতার আকৃতি ডুমুর পাতার মতো হলেও তা মসৃণ। সারা বছর সবুজ পাতা থাকে। এতে পাইকরের মতো গোলাকার ফল ধরে। তবে মাটিতে পড়ে থাকা ফল থেকে নতুন গাছ জন্মাতে দেখা যায় না বলে জানান স্থানীয়রা।
ঐতিহ্যের অংশ, সংরক্ষণে উদ্বেগস্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে গাছটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পূজা-অর্চনার স্থান। ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার ও পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে গাছটি এখন এলাকার ঐতিহ্যের অংশ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় গাছটির শাখা-প্রশাখা ১৫ থেকে ২০ শতক জমিজুড়ে বিস্তৃত ছিল। ডালপালার ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে আশপাশের বাড়িতে ঠিকমতো রোদ পড়ত না। সময়ের সঙ্গে কিছু ডালপালা ভেঙে যাওয়ায় গাছটির বিস্তৃতি কমেছে। একসময় গাছটিতে বিশাল আকৃতির বিষধর সাপ বাস করত—এমন গল্পও প্রচলিত রয়েছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৬ বছর আগে রাজারহাট উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গাছটির গোড়া পাকা করে বেঁধে দেওয়া হয়। পরে ২০১৬ সালে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এর চারপাশ সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়। তবে নিয়মিত পরিচর্যা ও সংস্কারের অভাবে সেই অবকাঠামোও এখন নষ্ট হওয়ার পথে।
রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের সহকারী অধ্যাপক এটিএম সাজেদুর রহমান মণ্ডল চাঁদ বলেন, গাছটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় সংরক্ষণে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স