চলনবিলে অতিথি পাখির সমাগম, শিকারিদের ফাঁদে হুমকির মুখে নিরাপত্তা

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
শীতের আগমনে সিরাজগঞ্জের চলনবিলে বাড়ছে দেশি ও পরিযায়ী পাখির আনাগোনা। জলাশয়, ধানক্ষেত ও গাছপালায় আশ্রয় নিচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি। পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে বিলাঞ্চল। পাখি সংরক্ষণে এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তবে একদিকে পাখির নিরাপদ আবাস গড়ে উঠলেও অন্যদিকে বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে শিকারিরা। বিলের ধানক্ষেত ও জলাশয়ের পাশে বসানো হচ্ছে ফাঁদ। এতে অতিথি পাখিসহ দেশি প্রজাতির পাখির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, চলনবিলের দুর্গম এলাকাগুলোতে পাখি শিকার বন্ধে নিয়মিত নজরদারি, স্থায়ী পাহারাদার নিয়োগ এবং প্রশাসনের কার্যকর অভিযান প্রয়োজন। বিশেষ করে শীত মৌসুমে পাখির বিচরণ ও প্রজননস্থলগুলো সুরক্ষিত রাখা জরুরি।

জলাভূমিতে বাড়ছে পাখির বিচরণ

শীত মৌসুমে চলনবিলের জলাশয় ও ফসলের মাঠে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উপস্থিতি বাড়ে। জলাভূমিতে শামুকের প্রাচুর্য শামুকখোলের মতো পাখির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এ অঞ্চলে শামুকখোল, ডাহুক, ত্রিশূলবক, বালিহাঁস, রাতচরা, নীলশির ও লালশিরসহ নানা প্রজাতির পাখি দেখা যায়।

তবে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, খাদ্যসংকট এবং অবাধে পাখি শিকারের কারণে এসব পাখির নিরাপদ বিচরণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশে পাখির প্রজাতির সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন তালিকায় ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। বন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ৭১১ প্রজাতির পাখির উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পাখির তালিকায় বাংলাদেশের ৮৩৫ প্রজাতির তথ্য পাওয়া যায়। শ্রেণিবিন্যাস ও তালিকা তৈরির পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণে এ সংখ্যায় তারতম্য রয়েছে।

উলিপুর গ্রামে পাখির নিরাপদ আবাস

চলনবিলের তাড়াশ পৌরসভার ঐতিহাসিক হাট উলিপুর গ্রামে শত শত গাছে আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। শীতের আগমনে শামুকখোল, পানকৌড়ি, বক ও সারসসহ নানা পাখি সেখানে বাসা বেঁধেছে। সকালে খাবারের সন্ধানে আশপাশের জলাশয় ও ফসলের মাঠে ছড়িয়ে পড়ে পাখিগুলো। দিন শেষে আবার ফিরে আসে নিজেদের বাসায়।

পাখির বিষ্ঠায় বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ নোংরা হওয়াসহ দৈনন্দিন কাজে কিছুটা অসুবিধা হলেও পাখিদের তাড়িয়ে দিচ্ছেন না গ্রামবাসী। বরং নিজেরাই পাহারা দিয়ে পাখির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।

উলিপুর গ্রামের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, প্রথম দিকে কয়েকটি পাখি এসে গাছে বাসা বাঁধে। পরে গ্রামবাসী সম্মিলিতভাবে পাখির নিরাপত্তায় পাহারা দেওয়া শুরু করেন। পাখি শিকার করতে আসা কয়েকজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পাখির বিষ্ঠায় কিছুটা অসুবিধা হলেও গ্রামের মানুষ পাখিগুলোকে ভালোবাসেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থায়ী পাহারাদার নিয়োগের দাবি জানান তিনি।

দুর্গম এলাকায় ‘কেল্লা ফাঁদে’ শিকার

উলিপুর গ্রামে পাখি সংরক্ষণে স্থানীয়দের উদ্যোগ প্রশংসিত হলেও চলনবিলের অন্যান্য এলাকায় পরিস্থিতি ভিন্ন। কয়েক দিন আগে তাড়াশ উপজেলার পাটগাড়িপাড়া মৌজার একটি ধানক্ষেতে পাখি শিকারের ফাঁদ দেখা গেছে।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত পাখি শিকারের ঘটনা ঘটে। তাড়াশের বারুহাঁসসহ চলনবিলের দুর্গম এলাকাগুলোতে শিকারিরা ‘কেল্লা ফাঁদ’ ব্যবহার করেন। এসব এলাকায় যাতায়াত কঠিন হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষে সব স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

আবাসস্থল সংকটে অস্তিত্বের ঝুঁকি

রাজশাহী বিভাগীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, দেশে পাখির মোট সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। চলনবিলে দেশি পাখির পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পরিযায়ী পাখি আসে। তবে নিরাপদ আবাসস্থল না থাকলে পাখির স্বাভাবিক বিচরণ ও টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, জনসংখ্যার চাপ, গাছ কাটা, পাখি শিকার ও খাদ্যসংকটের কারণে পাখির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। চলনবিলের জলাভূমি ও শামুকের প্রাচুর্য শামুকখোলের মতো পাখির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে। পাখি রক্ষায় গাছপালা ও জলাভূমি সংরক্ষণের পাশাপাশি শিকার বন্ধ করা জরুরি।

অভয়ারণ্য ঘোষণার উদ্যোগ প্রশাসনের

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, শীতকালে চলনবিলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আগমন ঘটে। স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে উলিপুর গ্রাম পাখির নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামটিকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, পাখির নিরাপত্তায় পাহারাদার নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে। পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পাখির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই চলনবিলের জলাভূমি, গাছপালা ও পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণের পাশাপাশি শিকারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুর




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad