ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বেসরকারি খাতের ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এতে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকঋণের চাহিদায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে। টানা সাত মাস ধরে এ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। অন্যদিকে গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।
নতুন বিনিয়োগে অনীহা, ঋণপ্রস্তাব কম
ব্যাংকারদের ভাষ্য, সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট না থাকলেও কিছু ব্যাংক সংকটে রয়েছে। যেসব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো, সেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও নতুন ঋণ বিতরণে বাড়তি ঝুঁকি নিতে চাইছে না। অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তা কিংবা ছোট ব্যবসা থেকে বড় পর্যায়ে যাওয়ার মতো গ্রাহকও তৈরি হচ্ছে না।
ফলে ব্যাংকগুলো পুরোনো ও নির্ভরযোগ্য করপোরেট গ্রাহকদের ওপর বেশি নির্ভর করছে। অনেক পুরোনো উদ্যোক্তাও নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ঋণ ও দায় সমন্বয়ে মনোযোগ দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বাজারে নতুন উদ্যোক্তা বা ছোট ব্যবসা থেকে বড় হওয়ার মতো গ্রাহক তৈরি হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো মূলত পুরোনো ও নির্ভরযোগ্য করপোরেট গ্রাহকদের ওপর নির্ভর করছে। নতুন উদ্যোক্তা না থাকায় ঋণের প্রস্তাবও প্রায় আসছে না।
প্রকৃত ঋণপ্রবাহ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি
ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক সম্মেলনে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের বেশি দেখানো হলেও প্রকৃত নতুন ঋণপ্রবাহ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। অনাদায়ী সুদ ঋণের হিসাবে যুক্ত হওয়া এবং আগের ঋণের দায় মেটাতে নতুন ঋণ সৃষ্টির মতো বিষয় বাদ দিলে প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধির চিত্র আরও দুর্বল হতে পারে।
বিনিয়োগ স্থবিরতার উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, ব্যাংকগুলোতে বড় অঙ্কের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার চাহিদা নেই। নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা বিদ্যমান কারখানা সম্প্রসারণেও উল্লেখযোগ্য ঋণ নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। এমনকি ঋণসীমা অনুমোদনের পরও অনেকে তা ব্যবহার করছেন না। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি না কাটায় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে সতর্ক রয়েছেন।
প্রণোদনা তহবিলেও ঋণ বিতরণ ধীর
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে এ তহবিল থেকেও ঋণ বিতরণে গতি নেই। এখন পর্যন্ত ছাড় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রভাব ব্যাংকগুলোতে স্পষ্ট। আগের তুলনায় নতুন ঋণ প্রস্তাব ও আবেদনের পরিমাণ অনেক কমেছে। ঋণের গতি ফেরাতে বিভিন্ন নতুন স্কিম চালু করা হলেও সেগুলোর ইতিবাচক প্রভাব আসতে সময় লাগবে। কিছু স্কিম সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। তবে নতুন ঋণ প্রস্তাব কমলেও গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা অব্যাহত রয়েছে।
এনআরবি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিমিয়া সাদাত বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা কারণে বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। উদ্যোক্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাই চলতি বছরে ঋণ প্রবৃদ্ধি খুব একটা বাড়ার সম্ভাবনা নেই। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আগামী বছর ঋণ প্রবৃদ্ধিতে গতি ফিরতে পারে।
সাত মাস ধরেই ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এপ্রিলে প্রবৃদ্ধি একই পর্যায়ে ছিল। মে মাসে তা সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ হয়। এরপর জুন ও জুলাইয়ে আবার কমে যায়। আগস্টে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে।
আইএফআইসি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান ঋণ কর্মকর্তা শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদ বলেন, উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমেছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের উচ্চ চাপের কারণে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিকেই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ও তারল্যসংক্রান্ত তথ্য, বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্য ।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক