প্রতিবছর ৮ নভেম্বর বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস পালিত হয়। পরিকল্পিত, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরাই এ দিবসের মূল লক্ষ্য। একটি নগর কেবল উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক স্থাপনার সমষ্টি নয়; বরং নাগরিকের স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং মৌলিক সেবা নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়েই একটি নগরের প্রকৃত উন্নয়ন পরিমাপ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের নগরায়ণের বাস্তব চিত্রে পরিকল্পনার চেয়ে অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ, জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ এবং নাগরিক সুবিধার চেয়ে অব্যবস্থাপনাই বেশি দৃশ্যমান।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতেও অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রভাব ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। যেখানে-সেখানে ভবন নির্মাণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ফুটপাত দখল, সড়কের ওপর অবৈধ স্থাপনা, অপর্যাপ্ত পার্কিং এবং জলাশয় ভরাটের ফলে নগরজীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, সামান্য দূরত্ব পাড়ি দিতে দীর্ঘ সময় এবং প্রতিদিনের যাতায়াতে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এখন অনেক শহরের পরিচিত বাস্তবতা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সড়কব্যবস্থায়। সড়ক নির্মাণ বা সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় পথচারী, শিক্ষার্থী, নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপত্তা যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। অনেক সড়কে ফুটপাত নেই, কোথাও ফুটপাত থাকলেও তা দখল হয়ে আছে। যত্রতত্র যানবাহন থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা, অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র বাজার ও যানবাহনের বিশৃঙ্খল চলাচল যানজটকে স্থায়ী সমস্যায় পরিণত করেছে। এর সরাসরি মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
একজন কর্মজীবী মানুষ প্রতিদিন যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছেন। শিক্ষার্থীরা সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারছে না। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে স্বজনদের পড়তে হচ্ছে চরম বিপাকে। ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের বাড়ছে সময় ও অর্থের অপচয়। অর্থাৎ অপরিকল্পিত নগরায়ণের বোঝা বহন করছে পুরো সমাজ।
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন কিংবা মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নির্ধারিত বাসস্ট্যান্ড, পর্যাপ্ত ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, সাইকেল চলাচলের উপযোগী পথ এবং কঠোরভাবে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ। একই সঙ্গে সড়ক দখল, অবৈধ পার্কিং ও যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
নগর পরিকল্পনায় আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, বাজার, বিনোদন ও পরিবহনব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি। শুধু ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিলেই উন্নয়ন হয় না; প্রয়োজন পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান, জলাধার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা। উন্নয়নের নামে কৃষিজমি, খাল, নদী ও জলাশয় ধ্বংস করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও পরিবহন বিভাগ, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন, নিয়মিত পরিবীক্ষণ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে নগর পরিকল্পনা ও নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশা, বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনা, সভা কিংবা স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এ দিবসকে সামনে রেখে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নগর উন্নয়নের বিদ্যমান দুর্বলতা চিহ্নিত করে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি শহরে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখা, যানজটপ্রবণ এলাকায় কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, নগরের উন্নয়ন মানে শুধু দালানকোঠার উচ্চতা বৃদ্ধি নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। যে নগরে মানুষ নিরাপদে হাঁটতে পারে না, নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে না, বিশুদ্ধ পরিবেশে শ্বাস নিতে পারে না, সেই নগরকে কখনোই প্রকৃত অর্থে উন্নত বলা যায় না।
পরিকল্পিত নগরায়ণ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের অধিকার। তাই অপরিকল্পিত উন্নয়নের লাগাম টেনে ধরে জনবান্ধব, নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত নগর গড়ে তুলতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে হলে নগর পরিকল্পনায় অবহেলা, অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতার অবসান ঘটাতেই হবে।

সম্পাদকীয় | প্রথম দর্পণ,