পাকিস্তানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়াতে ঢাকার উদ্যোগ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০২ দুপুর
  • ৯৫৩৩ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
বাণিজ্য বাধা দূর করতে ডিসেম্বরে যৌথ বৈঠক | দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই লক্ষ্য

পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় অঙ্কের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা। এ লক্ষ্যে পাকিস্তানের কাছে শুল্ক ও শুল্কবহির্ভূত বাণিজ্য বাধা দূর করার প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ। আগামী ১ ও ২ ডিসেম্বর ইসলামাবাদে দুই দেশের বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কর্মদলের (জেডব্লিউজিটি) প্রথম বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পাবে ওষুধ ও খাদ্যপণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, শুল্কায়ন এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পাকিস্তানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক জটিলতা ও বাণিজ্য বাধা রয়েছে। বিশেষ করে ওষুধ ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে পণ্যের মান, কারিগরি বিধিবিধান এবং স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত (এসপিএস) শর্ত পূরণে জটিলতার মুখে পড়তে হয় রপ্তানিকারকদের। এসব বাধা দূর করা গেলে পাকিস্তানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

যৌথ কর্মদলের বৈঠকে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য আরও বেশি বাজার প্রবেশাধিকার চাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হবে।

আমদানি-রপ্তানির চিত্র

বর্তমানে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে প্রধানত তুলা, বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক পণ্য, সিমেন্ট ক্লিংকার ও বিভিন্ন শিল্পের উপকরণ আমদানি করা হয়। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে রপ্তানি হয় পাট ও পাটজাত পণ্য, ওষুধ, চা, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড এবং তৈরি পোশাক।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, পাকিস্তানের বাজারে নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানো এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

মন্ত্রী পর্যায়ের সফর ও সমঝোতা স্মারকের উদ্যোগ

এদিকে পাকিস্তান সরকারের আমন্ত্রণে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের দেশটি সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে এ বিষয়ে ঢাকাকে অবহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীকে আতিথ্য দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান সরকার।

সম্ভাব্য এই সফরে বাংলাদেশের ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং পাকিস্তানের ট্রেডিং করপোরেশন অব পাকিস্তানের (টিসিপি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চুক্তিটি সই করতে চায় দেশটি।

প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দুই দেশের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সংস্থার মধ্যে সহযোগিতার কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। এর আওতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি-রপ্তানি এবং পারস্পরিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাণিজ্য ঘাটতির বড় ব্যবধান

পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল সুতা, কাপড় ও প্রস্তুত চামড়ার পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৯ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে পণ্য রপ্তানির মূল্য ছিল ৬ কোটি ডলারের কিছু বেশি। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল কাঁচা পাট, ওষুধ, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, চা ও তৈরি পোশাক।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে পাকিস্তান বাংলাদেশে ৭১ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৬ কোটি ৭২ লাখ ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ব্যবধান এখনো বিদ্যমান।

অর্থনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন বলেন, যেকোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ও দর-কষাকষি হতে হবে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বাস্তবতার ভিত্তিতে। অর্থনৈতিক বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে কোনো চুক্তি করা হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয় না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তুলনামূলক সুবিধা (কমপারেটিভ অ্যাডভান্টেজ) বিবেচনায় নিয়ে আমদানি-রপ্তানির কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ কর্মদলের বৈঠকে যেসব পণ্য বাংলাদেশ তুলনামূলক সহজে ও সাশ্রয়ীভাবে আমদানি করতে পারে, সেগুলো নিয়ে দর-কষাকষিতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একইভাবে বাংলাদেশের যেসব পণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনা ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রয়েছে, সেগুলোর বাজার সম্প্রসারণেও জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে উভয় দেশকেই নিজ নিজ স্বার্থ বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হতে পারে।

অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, বাণিজ্য আলোচনায় সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতিকেই সব সময় প্রধান বিবেচ্য বিষয় করা ঠিক নয়। কোনো দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ভালো থাকলে সেখানে আমদানি বাড়ানোর পরিবর্তে রপ্তানি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আবার যেসব দেশ থেকে তুলনামূলক সুবিধায় পণ্য আমদানি করা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে কার্যকর দর-কষাকষি করতে হবে।

তার মতে, প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক নির্ধারণে পণ্যভিত্তিক সুবিধা ও জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad