দেশে চলতি বছরের জুন মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত এবং ৫৬১ জন আহত হয়েছেন। এক মাসে সংঘটিত ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। নিহতদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মোটরসাইকেল চালক বা আরোহী।
শনিবার প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্র, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে ১৪৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এছাড়া ৯১ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট প্রাণহানির ২০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোদের মধ্যে ৫৭ জন ছিলেন চালক ও চালকের সহকারী।
একই সময়ে দেশে ৯টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত ও ৪ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ২১টি রেল দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ৭ জন আহত হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৩৪ জন, থ্রি-হুইলারের যাত্রী ১১২ জন, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ও ট্রলির আরোহী ৩৭ জন, বাসযাত্রী ২৭ জন, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের আরোহী ১৪ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ১৫ জন এবং রিকশা ও বাইসাইকেল আরোহী ৮ জন নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার স্থানভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জাতীয় মহাসড়কে ১৫১টি, আঞ্চলিক সড়কে ১৯৪টি, গ্রামীণ সড়কে ৬৪টি, শহরের সড়কে ৫৭টি এবং অন্যান্য স্থানে ৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ২০৬টি, মুখোমুখি সংঘর্ষে ১০৯টি, পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দিয়ে ৯৭টি, যানবাহনের পেছনে আঘাতের ঘটনায় ৫৩টি এবং অন্যান্য কারণে ৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
জুন মাসে মোট ৭১৩টি যানবাহন বিভিন্ন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ১৫৭টি, থ্রি-হুইলার ১৪১টি, বাস ১১৬টি এবং ট্রাক ১০৭টি।
সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে। মোট দুর্ঘটনার ৩১ দশমিক ৩৫ শতাংশ সকালবেলায়, ১৯ দশমিক ২৭ শতাংশ রাতে, ১৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ দুপুরে, ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ বিকেলে, ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ সন্ধ্যায় এবং ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ ভোরে ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১১৬টি দুর্ঘটনায় ১১৮ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে নিহত হয়েছেন ১১৩ জন এবং রাজশাহী বিভাগে ৭৭ জন। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে, যেখানে ১৯টি দুর্ঘটনায় ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৩২টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ৪৯ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে ৫৮ জন শিক্ষার্থী, ২৪ জন ব্যবসায়ী, ২১ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ১৯ জন বিক্রয় প্রতিনিধি, ১৭ জন এনজিও কর্মী, ১৩ জন ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ৬ জন পোশাকশ্রমিক, ৫ জন নির্মাণশ্রমিক, ৪ জন শিক্ষক, ৪ জন আইনজীবী, ৪ জন মসজিদের ইমাম বা খাদেম, ৩ জন প্রকৌশলী, ২ জন সাংবাদিক, ২ জন প্রতিবন্ধী, ১ জন পুলিশ সদস্য, ১ জন চিকিৎসক এবং ১ জন চীনা নাগরিক রয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, অতিরিক্ত গতি, চালকদের অদক্ষতা, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও ন্যায্য বেতনের অভাব, মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ।
সংস্থাটি সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে এসব সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।

শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ