দেশের চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। চাকরিপ্রত্যাশীর সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান ও শূন্যপদের সংখ্যা বাড়ছে না। ফলে একটি পদের বিপরীতে গড়ে শত শত আবেদন জমা পড়ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে একটি চাকরির পদের বিপরীতে গড়ে ১৫৯ থেকে ২৩৫টি আবেদন জমা পড়ে। কোভিড-১৯ মহামারির আগে যেখানে প্রতি পদের বিপরীতে গড়ে ১৭৩টি আবেদন ছিল, সেখানে কোভিড-পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৭টিতে। সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন এন্ট্রি লেভেলের চাকরিপ্রত্যাশীরা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিআইডিএস ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এনামুল হকের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি।
‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন চাকরির পোর্টালের তথ্যের ভিত্তিতে শ্রমবাজারের চাহিদা-জোগানের অবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক অতনু রাব্বানি।
গবেষণাটি দেশের বৃহত্তম অনলাইন চাকরির প্ল্যাটফর্ম বিডিজবসে প্রকাশিত চাকরির বিজ্ঞাপন এবং তার বিপরীতে জমা হওয়া আবেদন বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে ২০১৫ সালের ২৮ জুন থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
অধ্যাপক অতনু রাব্বানি বলেন, বাংলাদেশের মোট অর্থনীতির প্রায় ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতভিত্তিক। গবেষণায় ব্যবহৃত তথ্য মূলত আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের প্রতিনিধিত্ব করে। বিডিজবসের তথ্য আনুষ্ঠানিক খাতের প্রায় আড়াই শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করলেও তা দেশের চাকরির বাজারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে সহায়ক।
গবেষণায় আরও বলা হয়, ২০২০ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত করোনা মহামারিজনিত লকডাউনের সময় চাকরির বাজারে বড় ধরনের ধস নামে। ওই সময়ে চাকরির বিজ্ঞাপন ৭০ দশমিক ২ শতাংশ এবং শূন্যপদের সংখ্যা ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ কমে যায়। অন্যদিকে চাকরির আবেদন কমে ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে প্রতি পদের বিপরীতে আবেদনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮৭ দশমিক ৩, যা গবেষণার পুরো সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চাকরির শূন্যপদ সংকোচনের হার বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের (প্রায় ৪০ শতাংশ) তুলনায় বেশি এবং যুক্তরাজ্যের (৬০–৭০ শতাংশ) সমপর্যায়ের ছিল। করোনা-পরবর্তী সময়ে শ্রমবাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে প্রায় ৪১ সপ্তাহ সময় লেগেছে। এমনকি ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্তও চাকরির বাজারে অস্বাভাবিকতা প্রত্যাশিত মাত্রার তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বেশি ছিল।
গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনা মহামারি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির প্রভাবে চাকরির বাজারে উল্লেখযোগ্য সংকোচন সৃষ্টি হয়েছে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। তবে ২০২৫ সালের শেষ দুই প্রান্তিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আভাস পাওয়া গেছে।
তবে গবেষণায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব শ্রমবাজারে কীভাবে পড়েছে, সে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। মুক্ত আলোচনায় বক্তারা এ সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে ভবিষ্যতে গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করার পরামর্শ দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, সরকার বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, দেশে জ্বালানি সংকট রয়েছে। তবে এ সংকট মোকাবিলায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে জানান।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক