ভারতের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের মুখপাত্র আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী বলেছেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি ভারত থেকে গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং বাংলাদেশের তরুণদের জন্য তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে অশ্রুসিক্ত দোয়া করেছেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরকালে রাজধানীর নিকুঞ্জে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন সাংবাদিক আলী হাসান তৈয়ব।
দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর পর বাংলাদেশ সফরে এসে তিনি দেশের মানুষের ধর্মপ্রাণতা, আন্তরিকতা ও অতিথিপরায়ণতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও মানুষের ভালোবাসা ও আন্তরিকতা আগের মতোই অটুট রয়েছে।
আলেম-তরুণদের দূরত্ব কমানোর আহ্বান
বাংলাদেশে আলেমদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নেতৃত্বে তুলনামূলক কম উপস্থিতির প্রসঙ্গে সাজ্জাদ নোমানী বলেন, আধুনিক শিক্ষিত তরুণদের সঙ্গে আলেম সমাজের কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে না পারাই এর অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, মতভেদ ভুলে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভালোবাসা, সম্মান ও ইতিবাচক কার্যক্রমের মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
তিনি পরামর্শ দেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইসলামি বিষয়ক প্রবন্ধ, কুইজ, পাঠচক্র, বইপাঠ, পুরস্কার বিতরণ ও মসজিদভিত্তিক কোরআন-হাদিসের আলোচনা বাড়ানোর মাধ্যমে তরুণদের দ্বীনের প্রতি আগ্রহী করে তোলা সম্ভব।
নাস্তিক্যবাদ মোকাবিলায় যুক্তিনির্ভর দাওয়াত
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নাস্তিক্যবাদ ও চিন্তাগত বিভ্রান্তি মোকাবিলায় তিনি বলেন, তরুণদের সংশয় ও প্রশ্নগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা তুলে ধরতে হবে। তাদের সমালোচনা না করে ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
মানবসেবাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
নবী করিম (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য 'খেদমতে খালক' বা মানবসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, গরিব শিক্ষার্থী, রোগী, বিধবা, এতিম ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবসেবার মাধ্যমে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য তুলে ধরা উচিত।
ইসলামি রাজনীতিতে ন্যায়বিচার ও কল্যাণরাষ্ট্র
ইসলামি রাজনীতির বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে সাজ্জাদ নোমানী বলেন, প্রকৃত ইসলামি রাজনীতি হলো সকল নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার, সমতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়েই ইসলামি শাসনের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।
তিনি আরও বলেন, দাঈদের উচিত দল বা মতাদর্শের পরিবর্তে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা মানুষের সামনে উপস্থাপন করা, যাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য সুদৃঢ় হয়।
নারী শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব
নারীদের জন্য আলাদা ইসলামি শিক্ষামূলক কর্মসূচির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশ সফরে তার জন্য নারীদের কোনো পৃথক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়নি।
তার ভাষায়, সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে একটি আদর্শ সমাজ গঠন সম্ভব নয়। তাই নারীদের জন্যও পরিকল্পিত দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।
জুলাই আন্দোলন নিয়ে আবেগঘন মন্তব্য
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী বলেন, বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীরা আত্মত্যাগের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, "জুলাই আন্দোলনের প্রতিটি দিন আমি ভারত থেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। বাংলাদেশের সন্তানদের জন্য তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে দোয়া করেছি।"
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের আন্দোলন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণদেরও অনুপ্রাণিত করেছে এবং সফল গণআন্দোলনের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের আহ্বান
বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, স্বাধীন দেশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
তার মতে, ইসলাম মানবজাতির সার্বিক কল্যাণ, উন্নয়ন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ঐশী কর্মসূচি। তাই ইসলামের শিক্ষা মানুষের সামনে ইতিবাচক, মানবকল্যাণমূলক ও বাস্তবসম্মত ভাষায় তুলে ধরতে হবে।
তিনি বলেন, হালাল উপার্জন, সম্পদ সৃষ্টি, এতিম-অসহায়দের দায়িত্ব গ্রহণ, দান-সদকা ও মানবসেবার মাধ্যমে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য সমাজে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক