হাসিনা দেশ ছেড়েছেন’—ব্রেকিং দেওয়ার পর মুখস্থ সব সুরা পড়েছিলাম: শফিকুল আলম

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৭ দুপুর
  • ৬৬৯১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরার অভিজ্ঞতা, ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যেও সংবাদ পরিবেশনের সংগ্রাম এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর প্রথম প্রকাশের পেছনের নাটকীয় মুহূর্তগুলো তুলে ধরেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ও সাবেক এএফপি বাংলাদেশ ব্যুরো প্রধান শফিকুল আলম।

আমার দেশ–এর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর প্রকাশ করা ছিল তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি। খবরটি প্রকাশের পর দীর্ঘ সময় উৎকণ্ঠায় কাটে। তিনি বলেন, “ব্রেকিং দেওয়ার পর এতটাই দুশ্চিন্তায় ছিলাম যে, মুখস্থ যত সুরা ছিল সব পড়েছি।”

একই আলোচনায় অংশ নেন আমার দেশ–এর যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ। তিনি জুলাই আন্দোলনের সময় ২৭টি মামলা মাথায় নিয়েও কীভাবে মাঠে থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন, সে অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন।

আন্দোলনের শুরু থেকেই নজর

শফিকুল আলম জানান, ৫ জুন হাইকোর্টের রায়ের পর থেকেই এএফপি ধারণা করেছিল যে কোটা আন্দোলন নতুন মাত্রা পেতে পারে। প্রথমদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে ছোট পরিসরে কর্মসূচি চললেও ৭-৮ জুলাই শাহবাগ অবরোধের মধ্য দিয়ে আন্দোলন গতি পায়।

তিনি বলেন, আন্দোলনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ এবং সমন্বয়কদের সুপরিকল্পিত কৌশল দেখে তখনই তাঁর ধারণা হয়েছিল, এবার আন্দোলন বড় পরিসরে যাবে।

‘রাজাকার’ মন্তব্যের পর গণবিস্ফোরণ

শফিকুল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘রাজাকার’ ইস্যুতে দেওয়া বক্তব্যের পর আন্দোলন গণবিস্ফোরণের রূপ নেয়। ১৬ জুলাই আবু সাঈদের নিহত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার শুরু করে।

তিনি বলেন, ১৮ জুলাই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। শুরুতে রাবার বুলেট, টিয়ারগ্যাস ও ছররা গুলি ব্যবহার করা হলেও বিকেল থেকে সরাসরি গুলি চালানো হয়। হাসপাতালগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করেই তাঁরা হতাহতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

ইন্টারনেট বন্ধ, তবু থেমে থাকেনি সংবাদ

১৮ জুলাই রাতে দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে বহু আগে থেকে স্থাপিত বিকল্প ভিস্যাট সংযোগের কারণে এএফপি সীমিতভাবে কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

শফিকুল আলম জানান, শুধু নিজেদের জন্য নয়, রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, গার্ডিয়ান, আলজাজিরা, এপি, নেত্র নিউজসহ বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি সাংবাদিকদেরও সেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেন। পাশাপাশি প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরাও ওই সংযোগ ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও পাঠান।

তিনি বলেন, পাঁচটি কম্পিউটারে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন পর্যন্ত সাংবাদিক কাজ করেছেন। সময় ভাগ করে দিয়ে সবাইকে সহযোগিতা করা হয়েছিল।

হুমকি উপেক্ষা করেই সংবাদ প্রকাশ

শফিকুল আলমের দাবি, আন্দোলনের সময় তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং আন্দোলন শেষে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, সমন্বয়কদের গ্রেপ্তারের পর আন্দোলন স্থগিত হয়েছে—এমন সরকারি বক্তব্যের বিপরীতে বিকল্প তথ্য প্রকাশ করায় চাপ আরও বাড়ে। তবু তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখা হয়।

‘ইয়াং জার্নালিস্টরাই ইতিহাস গড়েছেন’

জুলাই আন্দোলনের সাংবাদিকতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে শফিকুল আলম বলেন, একই সময়ে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী এবং সবচেয়ে কলঙ্কজনক—দুই ধরনের সাংবাদিকতাই দেখা গেছে।

তার মতে, তরুণ সাংবাদিক, ভিডিও জার্নালিস্ট ও মোবাইল সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে কিছু জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বয়ান তৈরির চেষ্টা করেছেন।

এম আবদুল্লাহর অভিজ্ঞতা

আমার দেশ–এর যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ বলেন, পত্রিকা বন্ধ থাকলেও তিনি আন্দোলনের প্রতিদিনের তথ্য সংগ্রহ, ভিডিও সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন সাংবাদিকের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছেন।

তিনি জানান, ১৮ জুলাই উত্তরার ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর তাঁকে একাধিকবার হুমকি দেওয়া হয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও পোস্ট সরিয়ে নেওয়ার চাপ ছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

‘হাসিনা দেশ ছেড়েছেন’—সবচেয়ে বড় ব্রেকিং

৫ আগস্টের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শফিকুল আলম বলেন, দুপুরের দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানতে পারেন শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন। তবে একটি সূত্রের ভিত্তিতে এএফপি সংবাদ প্রকাশে রাজি হয়নি।

পরে আরও দুটি স্বাধীন সূত্র থেকে তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর এএফপি খবরটি ব্রেকিং হিসেবে প্রকাশ করে।

তিনি বলেন, “ব্রেকিং যাওয়ার পর দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত আমি ভীষণ উদ্বেগে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, যদি তথ্য ভুল হয়, তাহলে আমার জেলও হতে পারে, ব্যুরোও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই মুখস্থ যত সুরা ছিল, সব পড়েছি। পরে সেনাপ্রধানের ভাষণের ঘোষণা আসার পর নিশ্চিত হই যে খবরটি সঠিক ছিল।”

‘জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন মতপ্রকাশের সুযোগ’

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মূল্যায়নে শফিকুল আলম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে।

তাঁর ভাষায়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ফৌজদারি অভিযোগ রয়েছে এবং বিষয়গুলো আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিচার হওয়া উচিত।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad