অপরিকল্পিত উন্নয়নে সংকুচিত হচ্ছে চলনবিল, বছরে কমছে ১.৮৩ বর্গকিলোমিটার আয়তন

  • মোঃ আল আমিন হোসেন,বার্তা সম্পাদক
  • আপলোড সময় : ৩১ জুলাই ২০২৬, ০২:৪১ দুপুর
  • ১৭০৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

দেশের বৃহত্তম প্রাকৃতিক জলাভূমিগুলোর অন্যতম চলনবিল দিন দিন হারাচ্ছে তার ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, মহাসড়ক ও বাঁধ নির্মাণ, পুকুর খনন, নদ-নদীর নাব্যতা সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এই বিলের আয়তন। বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে চলনবিলের আয়তন কমছে প্রায় ১ দশমিক ৮৩ বর্গকিলোমিটার।

একসময় রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা নিয়ে বিস্তৃত থাকলেও বর্তমানে চলনবিলের অবস্থান নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৬০০টি গ্রামজুড়ে সীমাবদ্ধ। একসময়ের এক হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত এই জলাভূমি বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটারে নেমে আসে।

চলনবিলে থাকা ৪৭টি ছোট-বড় নদীর অধিকাংশই পলি জমে ভরাট হয়ে স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। এর ফলে মাছের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে। একসময় প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বিলের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ—বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, গজার, শোল, পুঁটি, টেংরা, পাবদাসহ অসংখ্য মাছ এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ না থাকায় পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।

মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশীয় শুঁটকি শিল্পও ক্ষতির মুখে পড়েছে। একসময় বিদেশে রপ্তানি হওয়া শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হাজারো পরিবারের জীবিকা আজ হুমকির মুখে।

তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের পর চলনবিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়। এরপর ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণ বিলের পরিবেশগত ভারসাম্যে নতুন চাপ সৃষ্টি করে।

এছাড়া ১৯৯৫-৯৬ থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছরের মধ্যে চলনবিল এলাকায় ১ হাজার ১৮৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার, ২১টি স্লুইসগেট এবং ১৫টি পোল্ডার নির্মাণ করা হয়েছে। এসব অবকাঠামোর কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে।

সিংড়ার শেরকোল এলাকায় পানির গতিপথ বন্ধ করে হাইটেক পার্ক ও আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার নির্মাণের ফলে আশপাশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে গত ১২ বছরে চলনবিলজুড়ে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার পুকুর খননের কারণে পানির স্বাভাবিক চলাচল আরও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮২৭ সালে জনবসতি বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল প্রায় ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯০৯ সালের জরিপে তা উল্লেখ করা হয় ১৪২ বর্গমাইল। পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে বিলের আয়তন কমতে থাকে। বিভিন্ন তথ্যসূত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১১২ বছরে চলনবিলের আয়তন প্রায় ১৯৯ বর্গকিলোমিটার কমেছে, যা বছরে গড়ে ১ দশমিক ৮৩ বর্গকিলোমিটার।

বর্তমানে নাটোরের সিংড়া, নলডাঙ্গা, গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত পুকুর খননের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।

নাটোর বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, পলি জমে ভরাট হওয়া এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে চলনবিলের পরিধি দিন দিন কমছে। খালের মুখে বাঁধ নির্মাণ ও পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়াও এ সংকটকে আরও তীব্র করছে।”

পরিবেশবিদদের মতে, চলনবিলের প্রাকৃতিক প্রবাহ রক্ষা, নদ-খাল পুনঃখনন, অবৈধ পুকুর খনন ও অবৈধ জাল ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ না করলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমি ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবেশগত সংকটে পড়তে পারে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad