কারফিউর সেই রাতে পঙ্গু হাসপাতালে: ‘বিবেকের তাড়নায়’ চিকিৎসাসেবার স্মৃতিচারণ এক অর্থোপেডিক সার্জনের

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:২৭ দুপুর
  • ২৫৮৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাত। রাজধানীজুড়ে কারফিউ, রাস্তাঘাট জনশূন্য, চারদিকে থমথমে পরিস্থিতি। এমন সংকটময় সময়ে কোনো সরকারি নির্দেশ বা আনুষ্ঠানিক তলব ছাড়াই শুধুমাত্র পেশাগত দায়িত্ববোধ ও মানবিক বিবেকের তাড়নায় রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)-এ ছুটে গিয়েছিলেন অর্থোপেডিক সার্জন ডা. শেখ সাদীউল ইসলাম।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় তিনি সেই রাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।

ডা. শেখ সাদীউল ইসলাম জানান, সে সময় তিনি খাতাকলমে হাসপাতালের আবাসিক সার্জন হলেও প্রশাসনিকভাবে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা থেকে কার্যত বঞ্চিত ছিলেন। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু প্রশাসনিক দায়িত্ব ওই পদের আওতায় থাকলেও বাস্তবে তিনি সেসব সুবিধা বা কর্তৃত্ব পাননি।

তিনি লেখেন, সেদিন হাসপাতাল থেকে কোনো ফোন বা নির্দেশ না এলেও ভেতর থেকে এক অদম্য তাগিদ অনুভব করেন। বাইরে তখন কারফিউ, রাস্তায় কোনো গণপরিবহন নেই। পুলিশের হয়রানির আশঙ্কায় হাসপাতালের পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে বাসা থেকে বের হন।

প্রথমে হেঁটে নিজের প্রাইভেট চেম্বারে যান, সেখানে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স পাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় পরে অন্য একটি হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে গাড়িতে করে পঙ্গু হাসপাতালের সামনে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

হাসপাতালে প্রবেশের পর তিনি যে দৃশ্য দেখেন, তা আজও তার স্মৃতিতে অমলিন। ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনে তখন ৭০ থেকে ৮০ জন আহত রোগীর ফাইল জমা পড়ে ছিল। অপারেশন থিয়েটারের ভেতরেও চিকিৎসার অপেক্ষায় ছিলেন আরও ৪০ থেকে ৫০ জন। অধিকাংশই আন্দোলনে আহত, যাদের কারও হাতে বা পায়ে গুলি, কারও হাড় চূর্ণবিচূর্ণ, আবার কেউ গুরুতর রক্তক্ষরণে সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন।

তার ভাষায়, সেদিন হাসপাতালটি আর শুধু হাসপাতাল ছিল না, যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।

ডা. সাদীউল ইসলাম জানান, সারা রাত চিকিৎসকরা নিরবচ্ছিন্নভাবে অস্ত্রোপচার ও জরুরি চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। যাদের অবিলম্বে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন ছিল, তাদের অপারেশন করা হয়েছে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষত পরিষ্কার, অস্থায়ীভাবে হাড় স্থিতিশীল করা এবং পরবর্তী চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক রোগী, সীমিত জনবল ও সময়ের মধ্যে পৃথিবীর উন্নত হাসপাতালেও সবাইকে তাৎক্ষণিক পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেওয়া কঠিন। তারপরও চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে আহতদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

পরদিন সকাল সাতটার দিকে হাসপাতাল থেকে বের হলেও বাসায় ফেরা ছিল আরেক চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও কোনো যানবাহন না পেয়ে হাঁটতে শুরু করেন। পরে একটি সিএনজি অটোরিকশা পেলেও চালক প্রথমে যেতে রাজি হননি। চিকিৎসক পরিচয় দেওয়ার পর ৮০০ টাকায় যেতে সম্মত হন।

তবে পথে একাধিক সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্ট এবং ব্যারিকেডের কারণে বিভিন্ন সড়ক ঘুরে প্রায় সাত কিলোমিটারের পথ প্রায় দ্বিগুণ দূরত্ব অতিক্রম করে বেইলি রোডে পৌঁছাতে হয়। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি কষ্ট হওয়ায় চালককে তিনি এক হাজার টাকা পরিশোধ করেন।

স্মৃতিচারণে তিনি আরও বলেন, আবাসিক সার্জনের দায়িত্বে হাসপাতালের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের সুযোগ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তিনি সেই সুবিধা পাননি। অথচ সংকটের সেই রাতে হাসপাতালে পৌঁছাতে তাকে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

লেখার শেষাংশে ডা. শেখ সাদীউল ইসলাম বলেন, তিনি কোনো নির্দেশে নয়, শুধুমাত্র বিবেকের তাড়নায় সেদিন হাসপাতালে গিয়েছিলেন। চিকিৎসক জীবনের কিছু রাত থাকে, যেগুলোর কোনো ডিউটি রোস্টার, অতিরিক্ত ভাতা বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকে না। থাকে শুধু মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর আত্মতৃপ্তি।

তার ভাষায়, “সেদিন মানুষ বিপদে ছিল। যতটুকু পেরেছি, পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।”




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad