যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আবারও আলোচনায় এসেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার আক্রমণাত্মক ভাষা ও ব্যক্তিগত কটাক্ষের কারণে। সমালোচকদের জবাব দিতে গিয়ে তিনি প্রায়ই বিদ্রূপ, গালি ও ব্যক্তিগত আক্রমণের আশ্রয় নিচ্ছেন। সর্বশেষ এক রক্ষণশীল কলাম লেখকের শারীরিক গঠন নিয়ে মন্তব্য করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তিনি।
ইরান ইস্যুতে ভ্যান্সের অবস্থানের সমালোচনা করেছিলেন রক্ষণশীল কলাম লেখক মার্ক থিয়েসেন। কয়েক দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থিয়েসেনকে লক্ষ্য করে ভ্যান্স কটাক্ষ করেন। থিয়েসেন এক পোস্টে লিখেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবারের তালিকায় বুরিটো থাকলে দাম নিয়ে অভিযোগ করার প্রয়োজন নেই। এর জবাবে ভ্যান্স ইঙ্গিত করেন, থিয়েসেন হয়তো ক্যাফেটেরিয়া থেকে একাধিকবার বুরিটো নিয়েছেন।
ভ্যান্সের এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। অনেকেই থিয়েসেনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ভ্যান্সের নিজের ওজন কমানোর বিষয়টি সামনে আনেন। ভ্যান্সের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তিনি প্রায় ৩০ পাউন্ড ওজন কমিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আক্রমণ নতুন নয়। তবে দায়িত্বে থাকা কোনো ভাইস প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে এ ধরনের শারীরিক কটাক্ষ তুলনামূলকভাবে বিরল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সমালোচকদের প্রতিও কঠোর
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই সরাসরি ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করে আসছেন। তার সমালোচনার লক্ষ্য হয়েছেন বামপন্থি সমালোচক, সাংবাদিক এবং নিজ দলের রক্ষণশীল নেতারাও।
বিভিন্ন সময় তিনি সমালোচকদের ‘বোকা’, ‘অযোগ্য’ ও ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার বক্তব্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে প্রায়ই ব্যক্তিগত অযোগ্যতা বা অসততার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও একাধিকবার কঠোর মন্তব্য করেছেন ভ্যান্স। এবিসি নিউজের সাবেক প্রতিবেদক টেরি মোরানকে তিনি ‘বামপন্থি উগ্রবাদী’ বলে উল্লেখ করেন। জিউইশ ইনসাইডারের সাংবাদিক জশ ক্রুশারকে নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, তিনি হয় ‘ওয়াশিংটনের সবচেয়ে পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিক’, নয়তো ‘সবচেয়ে বোকা সাংবাদিক’।
নিজ দলের সমালোচকদেরও ছাড় দেননি ভ্যান্স। ইরান নীতি নিয়ে মন্তব্য করায় ডেভিড রিবোইকে তিনি ‘লুজার’ বলে আখ্যা দেন। একইভাবে ডানপন্থি প্রভাবশালী লরা লুমারের সমালোচনা করে বলেন, তিনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে অযথা বিভেদ তৈরি করছেন।
কড়া ভাষা নিয়ে বিতর্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্যান্সের ভাষা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয় তার কটু ও আক্রমণাত্মক শব্দচয়নের কারণে।
এক পডকাস্টারের মন্তব্যের জবাবে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি এই আত্মবিশ্বাসী ও অহংকারী বাজে কথাকে ঘৃণা করি।’
এছাড়া ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে ট্রাম্প ও জেফ্রি এপস্টেইন সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেটিকে ‘সম্পূর্ণ বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দেন তিনি। স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিষয়ক মন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রকে নিয়ে সিনেটরদের সমালোচনার জবাবে ভ্যান্স লেখেন, ‘আপনারা মিথ্যা বলছেন এবং সবাই তা জানে।’
প্রচলিত রাজনৈতিক শিষ্টাচার থেকে ভিন্ন
ইতিহাসে ভাইস প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই সরকারের কঠোর মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করলেও ব্যক্তিগত অপমানমূলক ভাষা ব্যবহার থেকে সাধারণত বিরত থেকেছেন।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, আধুনিক সময়ের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন স্পাইরো টি. অ্যাগনিউ। তবে তার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম না থাকায় বক্তব্য এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েনি।
অন্যদিকে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স দায়িত্ব পালনকালে তুলনামূলক সংযত ছিলেন।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির যোগাযোগ পরিচালক কেভিন কেলেমস বলেন, এ ধরনের আচরণ ভাইস প্রেসিডেন্টের পদের সঙ্গে মানানসই নয়। তার মতে, ভ্যান্স অনেকটা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য তরুণদের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘাতমুখী আচরণ করছেন।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের যোগাযোগ পরিচালক জামাল সিমন্সের ধারণা, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন নিশ্চিত করতেই ভ্যান্স নিজের রাজনৈতিক অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছেন।
সমর্থকদের ভিন্ন ব্যাখ্যা
ভ্যান্সের সমর্থক ও সহযোগীদের দাবি, তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের মতো সরাসরি কথা বলেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক শিষ্টাচারের আড়ালে না থেকে তিনি মানুষের বাস্তব উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ভ্যান্স নিজেও বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে সাধারণ মানুষের ‘ফিল্টারহীন ও বাস্তব মতামত’ জানার সুযোগ করে দেয়। গত বছরের শুরুতে এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্মের মানুষ হিসেবে তিনি মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে বিশ্বাসী।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের নেতিবাচক দিকও স্বীকার করেছেন তিনি। চলতি বছরের মে মাসে ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ হিসেবে কিছুদিনের জন্য ফোন থেকে ‘এক্স’ অ্যাপ সরিয়ে রেখেছিলেন। তার ভাষ্য, ওই সময় তিনি বেশি মনোযোগী ও উৎপাদনশীল ছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরে ভিন্ন চিত্র
অনলাইনে আক্রমণাত্মক হলেও জনসম্মুখে অনেক ক্ষেত্রে ভ্যান্সকে তুলনামূলক সংযত দেখা যায়।
জুন মাসে প্রকাশিত তার বই Communion-এ তিনি নিজের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। সেখানে ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান থেকে নাস্তিকতা এবং পরে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণের যাত্রার বর্ণনা রয়েছে।
বইটির প্রচারে এবিসির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান The View-এ অংশ নিয়ে উদারপন্থি উপস্থাপকদের সঙ্গে তীব্র মতবিনিময় করলেও তিনি ভদ্র আচরণ বজায় রাখেন। অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক জয় বেহার পরে মন্তব্য করেন, ভ্যান্সের রসবোধ রয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট হলে তিনি আরও নমনীয় হতে পারেন।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন?
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্যান্সের আচরণ অনেকাংশেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই অনলাইনে সমর্থক ও সমালোচক—উভয় পক্ষকেই সরাসরি আক্রমণ করে আসছেন।
তবে ভ্যান্সের বিশেষত্ব হলো, তিনি সমালোচকদের সঙ্গে প্রকাশ্য অনলাইন বিতর্কে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন। গত বছর নিজের এক সহযোগী বাকলি কার্লসনকে ঘিরে সমালোচনার জবাবে তিনি লিখেছিলেন, মতপার্থক্য তিনি মেনে নিতে পারেন, কিন্তু তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ সহ্য করবেন না।
থামার কোনো ইঙ্গিত নেই
ধর্মীয় কারণে সাময়িক বিরতি নিলেও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও সক্রিয় হয়েছেন জেডি ভ্যান্স। মার্ক থিয়েসেনকে নিয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সমালোচকদের সরাসরি জবাব দেওয়ার কৌশল থেকে তিনি সরে আসছেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংঘাতমুখী ও সরাসরি যোগাযোগই এখন ভ্যান্সের রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক