হাইপ্রোফাইল কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের সম্ভাবনা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:১০ দুপুর
  • ২৫৯৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগে মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে গতকাল দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণার পর সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাস নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। নতুন রাষ্ট্রপতির শপথের পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নতুন মুখ দেখা যেতে পারে বলে সরকারের বিভিন্ন সূত্রে আলোচনা রয়েছে।

আগামী ১৬ আগস্ট বর্তমান সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হবে। এর আগে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ছয় মাসের কর্মদক্ষতা, মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সরকারের ভাবমূর্তিতে তাদের ভূমিকা মূল্যায়ন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে সরকারি একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে কয়েকজনের দপ্তর পুনর্বণ্টন, কাউকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া এবং নতুন কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট কোটায়ও কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা চলছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে কে?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পদত্যাগের খবর প্রকাশের পর থেকেই সচিবালয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী দায়িত্বশীল ব্যক্তি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে।

একাধিক সূত্রের দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। সে ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির ওপর দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে। একই সঙ্গে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।

তবে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র থেকে ভিন্ন তথ্যও পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্য, সালাহউদ্দিন আহমদ আপাতত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই থাকছেন। কারণ গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখনই কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

এদিকে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ে একজন প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী থাকায় সেখানে নতুন মন্ত্রী নিয়োগের বিষয়টিও জটিল হয়ে উঠতে পারে। জানা গেছে, সালাহউদ্দিন আহমদের পক্ষ থেকে তার মন্ত্রণালয়ে কোনো প্রতিমন্ত্রী না রাখার অনুরোধ রয়েছে। তবে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান প্রতিমন্ত্রীকে সরানোর সম্ভাবনা আপাতত কম বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

এর মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন অথবা ড. আব্দুল মঈন খানকে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনাও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান প্রতিমন্ত্রীকে বহাল রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও সেলিমা রহমানের নামও সম্ভাব্য নতুন মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মূল্যায়ন

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রণালয়গুলোকে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ছয় মাস পর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়ন করা হবে বলেও জানানো হয়েছিল।

১৮০ দিনের সেই সময়সীমা সামনে রেখে মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে এখন বাড়তি সতর্কতা তৈরি হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাজের অগ্রগতি ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে ইতোমধ্যে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

বিশেষ সূত্রের দাবি, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, জনঅভিযোগ নিষ্পত্তি, সংসদে উপস্থিতি ও জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক ভূমিকার বিষয়েও তথ্য নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও বিভিন্ন মাধ্যমে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো মন্ত্রীর কর্মদক্ষতায় প্রধানমন্ত্রী সন্তুষ্ট না হলে তার দায়িত্ব পুনর্বণ্টন অথবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

কর্মদক্ষতাই হবে প্রধান বিবেচনা

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য রদবদলে রাজনৈতিক বিবেচনার পাশাপাশি মন্ত্রণালয় পরিচালনায় বাস্তব কর্মদক্ষতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও মান, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে নেওয়া উদ্যোগ, মাঠ প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সংসদে জবাবদিহি—এসব বিষয় মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হতে পারে।

সরকারের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে—এমন বিতর্কও মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে। তবে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দেখাতে না পারলেও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ না থাকলে সরাসরি বাদ না দিয়ে সতর্ক করে আরও সময় দেওয়ার নীতিও বিবেচনায় রয়েছে।

অর্থাৎ সম্ভাব্য রদবদলে শুধু মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়াই নয়, দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং কর্মদক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।

একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগ হতে পারে

মন্ত্রিসভায় রদবদলের অন্যতম কারণ হিসেবে এক ব্যক্তির হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সূত্র বলছে, বর্তমানে কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী একসঙ্গে দুই বা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। এতে কাজের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় সব মন্ত্রণালয়ে প্রত্যাশিত গতি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের হাতে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। শেখ রবিউল আলম সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।

আমিন উর রশিদ ইয়াছিন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং ফকির মাহবুব আনাম স্বপন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন।

এ ছাড়া আরিফুল হক চৌধুরী শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।

এসব অতিরিক্ত দায়িত্বের কিছু অংশ ভাগ করে নতুন মুখকে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে মন্ত্রিসভার আকার খুব বেশি না বাড়িয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রমে গতি আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আলোচনায় কয়েকজন মন্ত্রী

সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নামও আলোচনায় রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনার ওপরই নির্ভর করবে।

সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এবং কৃষি খাতের কয়েকটি কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়েও সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রতিবেদনের পার্থক্য নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে। পাশাপাশি সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় নিয়েও পরিবর্তনের আলোচনা রয়েছে।

টেকনোক্র্যাট কোটায় নতুন মুখের সম্ভাবনা

বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।

এ ছাড়া সরকারের শরিক ও সমমনা দলগুলোর কয়েকজন নেতাকেও মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। আলোচনায় রয়েছে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থর নামও।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন সদস্য বলেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ায় ওই মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী দায়িত্ব নেবেন। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বেশ কয়েকটি নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীই নেবেন।

তথ্যসূত্র: আমার দেশ




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad