প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চলতি মাসেই দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে নিতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে দিল্লি। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া এবং শীর্ষ পর্যায়ের সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে ভারত সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে।
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরে নিতে দিল্লির আগ্রহের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সামনে এসেছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাশাপাশি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এবং আলোচিত শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন আসামিকে হস্তান্তরের বিষয়েও ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে। প্রধানমন্ত্রী দিল্লি সফরে গেলে তিনি অখুশি হয়ে দেশে ফিরবেন না—এমন আশ্বাসও ঢাকাকে দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তবে দিল্লির এই তৎপরতায় সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত ভারত সফরে যাবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও জানিয়েছেন, ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে সুবিধাজনক সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সম্পর্কের টানাপোড়েন
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীকে সফরে নিতে ভারতের অতিরিক্ত আগ্রহের পেছনে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারতকে কিছুটা পিছিয়ে দিচ্ছে। ফলে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক উন্নয়নে দিল্লি সক্রিয় হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বললেও বাংলাদেশকে বিভিন্ন ইস্যুতে চাপের মধ্যে রাখার নীতি ভারত পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি। তাদের মতে, পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, পুশইনসহ দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কার্যকর সমাধান ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরপর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ প্রকাশ করলেও বিভিন্ন ইস্যুতে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।
পুশইন, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা এবং শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে গত ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, জুলাই বিপ্লবের বার্ষিকীতে শেখ হাসিনাকে দিয়ে জুলাই শহীদদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অপমান করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলেও সতর্ক করা হয়।
পরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং তার বক্তব্যকেও ভারত সরকার সমর্থন করে না।
হাসিনাকে ঘিরে দিল্লিতে মতবিভক্তি
দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একটি পক্ষ মনে করছে, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। অন্য পক্ষ এখনো বাংলাদেশকে বিভিন্ন ইস্যুতে চাপের মধ্যে রাখার পক্ষে।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের মতে, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র দপ্তর, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব—এই তিনটি পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার দাবি, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের সমর্থন ছিল না; বরং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশ ও ক্ষমতাসীন বিজেপির একটি অংশ এতে ভূমিকা রেখেছিল।
ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ও রীভা গাঙ্গুলী দাস সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যে শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে ভারতের গণমাধ্যমের একটি অংশ মনে করছে, বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের স্বার্থে হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক জটিলতা থেকে দিল্লির দূরে থাকা প্রয়োজন।
দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার এক নিবন্ধে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ অবস্থান তার নিজস্ব বিষয় হলেও ভারতের মাটি থেকে তাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিলে ঢাকার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও জটিল হতে পারে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক সম্পাদকীয়তেও শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সেই আশ্রয়স্থলকে রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি আলাদা করে দেখার কথা বলা হয়েছে।
ঢাকার বার্তা—আগে পরিবেশ তৈরি করতে হবে
দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ভারতের নীতিনির্ধারকরা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগী হয়েছেন।
গত ৯ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরদিন তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের আগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরা হয় বলে জানা গেছে।
ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে—সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ভারতকেই তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজনদের ফেরত পাঠানোর বিষয়েও ভারতের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করা হচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লি ফিরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি অবহিত করেন বলেও সূত্রের দাবি। শুধু কূটনৈতিক ও ‘ডিপস্টেট’ পর্যায়ের তৎপরতা দিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়; এর জন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন—এমন বার্তাও তিনি দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তড়িঘড়ি সফর নিয়ে প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
তবে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যোগ দেবেন না—ঢাকার পক্ষ থেকে এমন সিদ্ধান্ত দিল্লিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এর পরই দ্বিপক্ষীয় সফরের আলোচনা জোরালো হয়েছে।
ভারত সরকার চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি সফরে নিতে আগ্রহী। তবে এত অল্প সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামানের মতে, এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীকে তড়িঘড়ি করে দিল্লি সফরে নেওয়া ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার মতে, সফরের আগে বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পানি বণ্টন, পুশইন ও সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে সুস্পষ্ট অগ্রগতি ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর বাংলাদেশের জন্য সুফল বয়ে নাও আনতে পারে। একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান বা তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে ভারতের আপত্তি থাকবে না—এমন স্পষ্ট অবস্থানও দিল্লির কাছ থেকে প্রত্যাশিত বলে তিনি মনে করেন।
কার্যকর পদক্ষেপ চায় ঢাকা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, শুধু আশ্বাসের ভিত্তিতে দিল্লি সফর না করে ভারতকে আগে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, একদিকে ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছে, অন্যদিকে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে এবং শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এভাবে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া কঠিন।
তার মতে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ বা কোনো একটি আসামিকে ফেরত পাঠানোর পাশাপাশি পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পুশইনসহ দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলোর সমাধানে ভারতকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়েও পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে সফরটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে ফলপ্রসূ করতে হলে আগে থেকেই আলোচ্যসূচি, দ্বিপক্ষীয় সমস্যা ও প্রত্যাশিত ফলাফল স্পষ্ট করা জরুরি। শুধু কূটনৈতিক আশ্বাসের ভিত্তিতে তড়িঘড়ি সফর না করে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে মূল বিষয়।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক