ফায়ার কর্মীরা যেখানে ঢুকতে পারেননি, ঝুঁকি নিয়ে ৭ লাশ উদ্ধার করলেন সাইফুল

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৮ দুপুর
  • ৫৩৬৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে একটি শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নয় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্ঘটনার পর বিষাক্ত গ্যাসের কারণে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলও নিরাপত্তার ঝুঁকিতে স্বাভাবিকভাবে ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিপইয়ার্ডে প্রবেশ করে সাত শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল গনি।

শনিবার (১৫ আগস্ট) দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সাইফুল। শিপইয়ার্ডের ভেতরে কয়েকজন শ্রমিকের লাশ পড়ে থাকার খবর পেয়ে তিনি সেখানে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে গেটে বাধার মুখে পড়লেও পরে ভেতরে ঢুকে বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি উপেক্ষা করে একে একে সাতটি লাশ বাইরে নিয়ে আসেন। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন গ্রামবাসীও তাকে উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেন।

সাইফুল গনি বলেন, নিহতদের কয়েকজন তার এলাকার মানুষ ও প্রতিবেশী। তাদের লাশ বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে পড়ে আছে—এমন খবর পাওয়ার পর তিনি ঘরে বসে থাকতে পারেননি। জীবনের ঝুঁকি জেনেও তাদের উদ্ধারের জন্য ঘটনাস্থলে যান। পরে স্থানীয় গ্রামবাসীরাও উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন।

তবে দুর্ঘটনার পর শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কোনো সদস্যকে ঘটনাস্থলে দেখতে পাননি বলে অভিযোগ করেন সাইফুল। তার দাবি, সেখানে কোনো অ্যাম্বুলেন্সও ছিল না। উদ্ধারকাজে শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মামুন জানান, দুর্ঘটনাস্থল থেকে তখনো প্রচুর গ্যাস নির্গত হচ্ছিল। ফলে সেখানে প্রবেশ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। বিষাক্ত গ্যাসে উদ্ধারকারীরাও আক্রান্ত হতে পারেন। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সেখানে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব ছিল না। এ কারণে ঘটনাস্থলে আরও কোনো লাশ রয়েছে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, শিপইয়ার্ডের ভেতরে আরও লাশ থাকতে পারে। তবে গ্যাসের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে পুরো এলাকা নিরাপদে তল্লাশি করা সম্ভব হয়নি।

এ ঘটনায় মোট নয় শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে ভাটিয়ারীর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৌলভীপাড়ার দুই সহোদর মো. মনসুর ও মো. নাসির এবং একই ওয়ার্ডের শনি ঠাকুরপাড়ার পলাশ জলদাশ ও সানি জলদাশ রয়েছেন। একসঙ্গে এতগুলো প্রাণহানিতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

প্রথমদিকে ঘটনাটিকে গ্যাস বিস্ফোরণ বলে ধারণা করা হলেও পরে গ্যাস লিকেজ ও বিষক্রিয়ার বিষয়টি সামনে আসে। কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, টক্সিক গ্যাসের বিষক্রিয়ায় শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে।

দুই দপ্তরের বক্তব্যে গ্যাসের ধরন নিয়ে ভিন্নতা থাকায় গ্যাসটির প্রকৃত ধরন, উৎস, ঘনত্ব এবং কীভাবে গ্যাস ট্যাংকের ভেতরে জমেছিল—তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে দুর্ঘটনার পর শিপইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ট্যাংকে শ্রমিক প্রবেশের আগে গ্যাস শনাক্ত ও মাত্রা পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, ট্যাংক যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রস্তুত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি থাকলে তার দায় নির্ধারণেরও দাবি উঠেছে।

এর মধ্যেই সাইফুল গনির সাহসিকতার ঘটনা এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শিপইয়ার্ড এলাকা পরিদর্শনে যান বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী এফসিএ। এ সময় সাইফুল তার কাছে উদ্ধার অভিযানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তার কথা শুনতে সেখানে স্থানীয়রাও জড়ো হন।

বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকির মধ্যেও নিজের জীবনের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে সাতটি লাশ উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সাইফুল। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার মধ্যে তার এই মানবিক ও সাহসী ভূমিকা স্থানীয়দের কাছে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad