৪ শর্তে মুক্তি পেলেন ‘আয়নাবাজি’র শিকার সেই সোনা মিয়া

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫০ দুপুর
  • ৫০৬১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে পরে আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া সোনা মিয়া অবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে সোনা মিয়া নন; তিনি রমজান আলী নামে এক রোহিঙ্গা, যিনি সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে তার পরিচয় ধারণ করেছিলেন।

বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালত সোনা মিয়াকে চারটি শর্তে জামিন দেন। জামিনের আদেশ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কারাগারে পৌঁছানোর পর শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী মো. আব্দুল মান্নান এবং জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. ওবায়দুর রহমান।

জামিনের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—সোনা মিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র আদালতে জমা দেওয়া, প্রতি সপ্তাহে থানায় হাজিরা দেওয়া, কোনোভাবেই দেশত্যাগ না করা এবং প্রতি তিন মাস পরপর আদালতে হাজির হওয়া।

আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান জানান, মামলার প্রকৃত আসামি রমজান আলীকে দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যেভাবে ‘আয়নাবাজি’র শিকার সোনা মিয়া

ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওইদিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। ওই মামলার এজাহারে দুই নম্বর আসামি হিসেবে সোনা মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়। তার বাবার নাম দেওয়া হয় নজির আহমদ। ঠিকানা হিসেবে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়।

অভিযানের সময় এক ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া জন্মনিবন্ধনের ফটোকপির ভিত্তিতে তার নাম-পরিচয় সোনা মিয়া হিসেবে মামলার এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, দুই নম্বর আসামির দেওয়া নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ অনুসন্ধান করেও ওই পরিচয়ের কোনো ব্যক্তির সন্ধান পায়নি।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করেন, আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক না হওয়ায় তাকে জেলহাজতে রেখে বিচার কার্যক্রম শেষ করার জন্য আদালতের কাছে অনুরোধ করা হয়।

এরপর ২০২২ সালের ১৩ জুন কথিত সোনা মিয়া কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলায় সোনা মিয়াসহ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ের পর গত ২৩ জুন কক্সবাজারে দায়িত্বরত র‌্যাব-১৫-এর এক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসারের ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে গিয়ে সোনা মিয়া দাবি করেন, তিনি ওই মামলার আসামি নন। কারাগারে যাওয়ার পরই তিনি জানতে পারেন, মাদক মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

তদন্তে বেরিয়ে আসে প্রকৃত ঘটনা

বিষয়টি কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে জেলা জজ আদালত এবং পরে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় যায়। আদালতের নির্দেশে পুলিশ পুনরায় তদন্ত শুরু করে।

তদন্তে বেরিয়ে আসে, ২০২০ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলীও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আদালতের নির্দেশে সদর থানা পুলিশ নতুন করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান আলী। তিনি অন্য একজনের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, রমজান আলী ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে তারা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস করেন। একপর্যায়ে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের কপি রমজানের কাছে থেকে যায়। ওই জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন।

দুই ব্যক্তির পরিচয়েও ছিল বড় অমিল

তদন্তে দুই সময়ের কারাগারে সংরক্ষিত নথিতেও দুই ব্যক্তির পরিচয় ও শারীরিক বর্ণনায় বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া যায়।

২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির বাবার নাম মৃত নজির আহমদ, মায়ের নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা উল্লেখ করা হয়েছিল। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে বাম ও ডান গালে এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা নথিতে উল্লেখ ছিল।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া প্রকৃত সোনা মিয়ার বাবার নামও মৃত নজির আহমদ হলেও মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহু, পেটের বাম পাশ ও পিঠের মাঝখানে তিল থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।

তদন্ত ও জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

এ ঘটনায় তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই উল্লেখ করেছিলেন যে সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা সঠিক নয়। এরপরও কীভাবে ওই পরিচয়ে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার বিচার কার্যক্রম চলল, তিনি জামিন পেলেন এবং শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মামলার শুরু থেকে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তদন্ত কর্মকর্তার চরম গাফিলতি ছিল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কেউ অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে পরিচয় দিলে প্রকৃত পরিচয় যাচাই করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

তার ভাষ্য, সোনা মিয়ার প্রকৃত পরিচয় যে রমজান আলী, সেটিও তদন্তে বের করা হয়নি। ফলে প্রকৃত আসামি জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে যান। পরে তার পরিবর্তে প্রকৃত সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা ও র‌্যাবের বক্তব্য

মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এবং বর্তমানে বান্দরবানের রুমা থানার ওসি মানস বড়ুয়া বলেন, তদন্তের সময় মূল আসামির নাম-পরিচয় সঠিক পাওয়া যায়নি। সে অনুযায়ী তিনি অভিযোগপত্র দিয়েছিলেন। মিথ্যা পরিচয় দেওয়ায় ওই আসামিকে কারাগারে রেখে বিচার কার্যক্রম চালানোর কথাও তিনি উল্লেখ করেছিলেন।

অন্যদিকে কক্সবাজারে দায়িত্বরত র‌্যাব-১৫-এর সহকারী পরিচালক (আইন ও গণমাধ্যম) ও সহকারী পুলিশ সুপার আ. ম. ফারুক বলেন, আদালতের পরোয়ানার ভিত্তিতেই র‌্যাব আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। আদালত থেকে দেওয়া নাম-ঠিকানা অনুযায়ী পরিচয় যাচাই করে সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে চারটি শর্তে জামিন পাওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন সোনা মিয়া। এখন মামলার প্রকৃত আসামি রমজান আলীকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং তাকে আইনের আওতায় আনার বিষয়টি সামনে এসেছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad