চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতরে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন জানান, ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের একটি ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে। তারা মূলত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। পাশাপাশি সম্ভব হলে উদ্ধারকাজেও অংশ নেবে।
তিনি বলেন, জাহাজের ভেতরে এখনো গ্যাসের উপস্থিতি থাকায় সেখানে প্রবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে উদ্ধারকাজে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে একজন সাংবাদিকও গ্যাসে অসুস্থ হয়েছেন। তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দুই দফায় হাসপাতালে ৭ জন
কারখানায় থাকা একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতরে শ্রমিকেরা কাজ করছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে একে একে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ইশতিয়াক রহমান জানান, কারখানা থেকে দুই দফায় সাতজনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অপরজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিহতদের লাশ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর জানান, ঘটনাস্থলে আরও দুজনের লাশ পড়ে ছিল। পরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়ায়। সর্বশেষ হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৯ জনে পৌঁছেছে।
নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন—সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। তাঁদের বাড়ি ভাটিয়ারী এলাকায়।
চিৎকার শুনে ছুটে যান স্থানীয়রা
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, শুক্রবার সকালে হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে মানুষের চিৎকার শুনতে পান তাঁরা। পরে স্থানীয় কয়েকজন সেখানে গিয়ে অসুস্থ শ্রমিকদের গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখেন।
একপর্যায়ে স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতরে কয়েকজন শ্রমিকের লাশ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সকালে তাঁদের দুটি নৌকা সাগর থেকে ইলিশ ধরে উপকূলের দিকে ফিরছিল। কিন্তু কারখানার দিক থেকে আসা তীব্র গ্যাসের গন্ধের কারণে তাঁরা ওই এলাকার খালে ঢুকতে পারেননি। প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকা ভেড়াতে হয়েছে।
গ্যাসমুক্ত না করেই জাহাজ কাটার অভিযোগ
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল, সেটি আগে এলএনজি বহন করত।
তিনি বলেন, এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে ট্যাংকসহ অন্যান্য অংশ সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করতে হয়। কিন্তু প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট জাহাজটি যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত না করেই কাটার কাজ শুরু করা হয়েছিল।
তৌফিকুল ইসলাম আরও বলেন, জাহাজের কিছু ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস থাকতে পারে। এসব গ্যাস শ্রমিকদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া ঘটনাস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থাও খুবই দুর্বল ছিল বলে জানান তিনি।
কারখানার মালিকের প্রতিনিধি মো. মহিউদ্দিন বলেন, দুর্ঘটনার সময় তিনি কারখানার বাইরে ছিলেন। কারখানা থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, জাহাজে থাকা ছয় থেকে আটজন কর্মী অসতর্কতার কারণে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়েছেন। পরে কারখানায় গিয়ে তিনি বিস্তারিত জানাবেন।
দুর্ঘটনার পর কারখানা ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি থাকায় উদ্ধারকাজও ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে।
এদিকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং জাহাজটি যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত না করে কাটার কাজ শুরু করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক