আন্টার্কটিকার বরফ গলে সমুদ্রে ছড়াচ্ছে বিষাক্ত পারদ, বাড়ছে পরিবেশগত ঝুঁকি

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৫ দুপুর
  • ৩৬৪০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে দ্রুত গলছে আন্টার্কটিকার বরফ। দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন বিজ্ঞানীরা। এবার গবেষণায় আরও ভয়াবহ এক তথ্য উঠে এসেছে। আন্টার্কটিকার বরফে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত পারদ বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রে মিশে যাচ্ছে। এতে সামুদ্রিক পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক রাসায়নিকের তালিকায় রয়েছে পারদ। অল্প মাত্রাতেও এই ভারী ধাতু বিষাক্ত হিসেবে বিবেচিত। প্রাকৃতিকভাবে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় পরিবেশে পারদ ছড়ালেও শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো এবং খনন কার্যক্রমের কারণে এর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এতদিন আন্টার্কটিকার বরফ পরিবেশ থেকে পারদ শোষণ করে এক ধরনের প্রাকৃতিক ‘পারদ ভাণ্ডার’ হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু যে শিল্পকারখানা ও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে পারদ ও গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বাড়ছে, তারাই আবার বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত করছে। ফলে বরফ গলে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা পারদ এখন পরিবেশে ফিরে আসছে।

চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা আন্টার্কটিকার বরফ ও পারদ দূষণ নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য তুলে ধরেছেন। পরিবেশবিদ চেংঝেন ঝোউয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS)-এ।

গবেষণায় বিশেষভাবে আন্টার্কটিক উপদ্বীপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্টার্কটিকার এই অঞ্চলটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তুলনামূলক দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে এবং সেখানে বরফ গলার হারও বেশি। বিজ্ঞানীরা ওই এলাকার পলির নমুনা বিশ্লেষণ করে পারদ সঞ্চয়ের উদ্বেগজনক চিত্র দেখতে পেয়েছেন।

গবেষকদের মতে, বৈশ্বিকভাবে বিভিন্ন স্থানে যে পরিমাণ পারদ জমা হয়, আন্টার্কটিক উপদ্বীপের বরফে তার প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ পারদ সঞ্চিত রয়েছে। ইউরোপে অষ্টাদশ শতকের শিল্পবিপ্লবের পর ওই অঞ্চলে পারদ সঞ্চয়ের হার প্রায় ১৬০ শতাংশ বেড়েছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবেশে পারদ চলাচলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ চক্র রয়েছে। প্রথমত, বায়ুমণ্ডল থেকে পারদ সমুদ্রের পানিতে শোষিত হতে পারে এবং পরে আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলের পারদ হিমবাহে আটকে যায়। বরফ গলে গেলে সেই পারদ স্থলভাগ হয়ে নদী ও অন্যান্য জলপ্রবাহের মাধ্যমে সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে।

গবেষণার তথ্যমতে, বরফ গলার ফলে স্থলভাগে পারদের নির্গমন ৫৫০ শতাংশ এবং বায়ুমণ্ডল থেকে সমুদ্রে পারদের বিনিময় ৩৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে আন্টার্কটিকার বরফে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত পারদ ধীরে ধীরে দূষণের নতুন উৎসে পরিণত হচ্ছে।

এর সঙ্গে আরও একটি উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। আগের একটি গবেষণায় আন্টার্কটিকার বরফে এমন ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কথা জানা যায়, যা পারদকে অত্যন্ত শক্তিশালী নিউরোটক্সিন মিথাইলমারকারিতে রূপান্তর করতে পারে। এই বিষাক্ত যৌগ সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরে জমা হতে পারে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেও পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষক চেংঝেন ঝোউ মনে করেন, আন্টার্কটিকায় পারদ দূষণের বর্তমান প্রবণতা সেখানকার বাস্তুতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণেও দক্ষিণ মহাসাগরের বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরে পারদের মাত্রা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, আন্টার্কটিক উপদ্বীপ থেকে সমুদ্রস্রোতের মাধ্যমে খোলা সমুদ্রে পারদ যাওয়ার মাত্রা প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়েছে। এভাবে দূষিত পারদ ভবিষ্যতে আন্টার্কটিকার আশপাশের জলসীমা ছাড়িয়ে আরও দূরের সমুদ্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকরা।

বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু বরফ গলার মতো দৃশ্যমান সংকটই তৈরি করছে না; বরফের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিষাক্ত উপাদানও পরিবেশে ফিরিয়ে দিয়ে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো এবং আন্টার্কটিকার পরিবেশগত পরিবর্তনের ওপর নজরদারি জোরদার করা এখন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।

সূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad