ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের এক শিক্ষার্থীকে প্রভোস্টের কার্যালয়ে ডেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরুদ্ধ রেখে মানসিকভাবে হেনস্তা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া এবং জোরপূর্বক লিখিত বক্তব্যে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হলটির প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুনের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রভোস্ট। তাঁর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে না জেনে-শুনে তাঁকে নিয়ে লেখালেখির বিষয়ে জানতে ওই শিক্ষার্থীকে ডেকে আনা হয়েছিল এবং পরে তাকে নাস্তা করিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগকারী শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক। রোববার (১৬ আগস্ট) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি প্রভোস্টের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেন।
ইব্রাহীমের অভিযোগ, ফজলুল হক মুসলিম হলের বিভিন্ন সংকট, প্রভোস্টের ভূমিকা এবং হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যকারিতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সমালোচনামূলক পোস্ট শেয়ার করার পর তাকে হল অফিসে প্রভোস্টের কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের পছন্দের একটি খাবারের দোকান বন্ধ করে দেওয়া এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাজেট না দেওয়াসহ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েও ওই পোস্টে সমালোচনা করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
ইব্রাহীমের ভাষ্য, আগের একটি ঘটনার কথা মাথায় রেখে নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি মোবাইল ফোনে অডিও রেকর্ড চালু করে সেটি পকেটে রেখে প্রভোস্টের কক্ষে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে প্রভোস্ট তাঁর পকেটে থাকা মোবাইল ফোন বের করতে বলেন। তিনি ফোন বের করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে প্রভোস্ট চিৎকার করেন এবং তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন স্টাফ জোর করে মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেন বলে অভিযোগ করেন ইব্রাহীম। তাঁদের মধ্যে হলের ইলেকট্রিশিয়ান মারুফ ও প্রধান সহকারী আরিফ হোসেনসহ কয়েকজন ছিলেন বলে দাবি তাঁর।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কক্ষ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে কয়েকজন স্টাফ তাঁকে ধরে রাখেন এবং তাঁদের একজন দরজা বন্ধ করে দেন। পরে তাঁর মোবাইল ফোন পরীক্ষা করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
ইব্রাহীমের দাবি, এরপর প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে তাঁকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। হলের আবাসিক সিট বাতিল করে দেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে আবেদন করলে ছাত্রত্ব বাতিল করা এবং ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কারণে সাইবার মামলা করার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগকারী বলেন, একপর্যায়ে তিনি অসহায় বোধ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর দাবি, প্রভোস্টের কক্ষের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলেই ঘটনার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
ইব্রাহীম আরও অভিযোগ করেন, প্রভোস্টের স্টাফদের সঙ্গে নিয়ে একটি লিখিত বক্তব্য তৈরি করা হয় এবং তাঁকে সেটি নিজের হাতে লিখে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। ওই বক্তব্যে হল সংসদের ভিপি, জিএস, এজিএসসহ অন্যদের প্ররোচনায় পড়ে তিনি প্রভোস্টের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করেছেন—এমন কথা লেখা ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
এ সময় তাঁর মাকে ফোন করা হয় বলেও অভিযোগ করেন ইব্রাহীম। তাঁর ভাষ্য, কান্নাকাটি করার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে তাঁকে পানি ও ফল দেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য তিনি প্রভোস্টের কাছে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পোস্ট করবেন না বলে জানান। এরপর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর।
কক্ষ থেকে বের হওয়ার আগে পুরো ঘটনা কাউকে না বলতে এবং বাইরে গিয়ে সবাইকে ‘ঝামেলা মিটে গেছে’—এমন কথা বলার জন্য বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন ইব্রাহীম।
ইব্রাহীমের দাবি, মূল পোস্টের লেখক পিয়াস নামের এক শিক্ষার্থীকে প্রভোস্ট খুঁজছিলেন। পিয়াস অনাবাসিক হওয়ায় তাঁকে না পেয়ে ইব্রাহীমকে ডেকে এনে এ ধরনের আচরণ করা হয়েছে বলে প্রভোস্ট নিজেই তাঁকে জানিয়েছেন। পিয়াসকে খুঁজে বের করে ‘শায়েস্তা’ করা হবে বলেও তাঁকে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ইব্রাহীম বলেন, ‘যৌক্তিক সমালোচনা করার কারণে হলের দায়িত্বশীল জায়গা থেকে একজন শিক্ষার্থীর ওপর এমনভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিচার চাই।’
যা বললেন প্রভোস্ট
অভিযোগের বিষয়ে ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুন বলেন, ইব্রাহীম তাঁকে নিয়ে না জেনে-শুনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কিছু কথা লিখেছেন। এ কারণে তাঁকে ডেকে এনে বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়।
প্রভোস্টের ভাষ্য, ইব্রাহীম হলের খেলাধুলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অর্থ বরাদ্দ না থাকা এবং তাঁকে ‘সবচেয়ে খারাপ প্রভোস্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি করেছিলেন। এসব বিষয়ে জানতে তাঁকে ডেকে আনা হয়।
তিনি বলেন, ইব্রাহীমকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—তিনি কখনো তাঁর কাছে এসে বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন কি না। শিক্ষার্থী ‘না স্যার’ বললে প্রভোস্ট তাঁর সম্পর্কে না জেনে লেখা ঠিক হয়েছে কি না, তা জানতে চান। একপর্যায়ে ইব্রাহীম নিজের ভুল স্বীকার করেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ইব্রাহীমের মোবাইলে অডিও রেকর্ড চালু থাকার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান প্রভোস্ট। তাঁর প্রশ্ন, তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁদের কথোপকথন রেকর্ড করা যায় কি না।
ইব্রাহীমের মাকে ফোন করার বিষয়টিও স্বীকার করেন অধ্যাপক ইলিয়াস আল মামুন। তিনি জানান, শিক্ষার্থীর বাবা ফোন না ধরায় তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলেন এবং ছেলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখির বিষয়ে তাঁকে অবহিত করেন।
প্রভোস্টের দাবি, পরে ইব্রাহীমকে বসিয়ে নাস্তা করানো হয় এবং তাঁর মাকে আশ্বস্ত করা হয়। শিক্ষার্থী নিজের ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতে আর এ ধরনের কাজ করবেন না বলেও জানান বলে দাবি তাঁর।
তবে শিক্ষার্থীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন অধ্যাপক ইলিয়াস আল মামুন। তিনি বলেন, ‘দেড় ঘণ্টা মানসিক নির্যাতন কীভাবে করে? শারীরিক নির্যাতন, ছেলেকে কি মাইর দেওয়া যায়? এটা কি কথা হলো?’
প্রভোস্ট আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের কোনো বিষয়ে মন্তব্য বা অভিযোগ করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানা উচিত। হলের জন্য তিনি নিয়মিত কাজ করছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
এদিকে শিক্ষার্থীকে হেনস্তার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা।
রোববার রাত ৮টার দিকে হল প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইকবাল হায়দার, ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের ভিপি-জিএসসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। রাত ৯টার দিকেও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করতে দেখা যায়।
প্রশাসনের বক্তব্য
ঘটনার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ঘটনাস্থলে রয়েছেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ এসেছে, আবার হল প্রশাসনেরও বক্তব্য রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক