জ্বালানি সংকট: তিন মাস আগে দেওয়া জামায়াতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে চায় দলটি

  • শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ
  • আপলোড সময় : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৪ রাত
  • ৩৫৯২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তিন মাস আগে সরকারকে দেওয়া জামায়াতে ইসলামীর ১০ দফা পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তা জানতে চেয়েছে দলটি। নতুন করে পরিকল্পনা দেওয়ার পরিবর্তে ইতোমধ্যে দেওয়া প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রকাশের দাবি জানিয়েছে তারা।

রোববার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং জনদুর্ভোগ’ নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলগুলোর কাছে কার্যকর পরিকল্পনা চেয়েছেন। জামায়াত প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বানকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা তিন মাস আগেই সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ২১ মে থেকে সরকারের হাতে থাকা সেই পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে।

তিনি জানান, গত ২১ মে জাতীয় সংসদের জ্বালানি সংকটসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরা লিখিতভাবে ১০ দফা সুপারিশ জমা দেন। ওই কমিটিতে জামায়াতে ইসলামীর তিনজন সদস্যসহ বিরোধী দলের মোট পাঁচজন সদস্য ছিলেন। তারা দুটি বৈঠকে অংশ নিয়ে সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রশ্ন ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন। পরে ৭ জুন জ্বালানিমন্ত্রী ওই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন।

জামায়াতের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে বিদ্যমান কূপে দ্রুত ওয়ার্কওভার, ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাস জাতীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ, স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) দ্রুত চালু করা, জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় ডিজিটাল মনিটরিং এবং রুফটপ সোলার সম্প্রসারণ।

গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ৮ আগস্টও জামায়াতের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি তার বাস্তবায়নও জরুরি। তিনি জানতে চান—কোন সুপারিশে কাজ শুরু হয়েছে, কোনটি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোনগুলো এখনো কাগজে পড়ে আছে।

জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান গত ১৪ আগস্ট জ্বালানি সংকট নিরসনে জাতীয় সংসদের জরুরি অধিবেশন আহ্বানের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। চিঠির একটি কপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও দেওয়া হয়েছে।

৯০ দিনে ছয়টি কাজের প্রস্তাব

গোলাম পরওয়ার বলেন, তিন মাসে সমুদ্রভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের ফল পাওয়া বা বড় কোনো নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তবে ৯০ দিনের মধ্যে অন্তত ছয়টি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত ফলদায়ক গ্যাসকূপে ওয়ার্কওভার শুরু, বন্ধ ও কম উৎপাদনশীল কূপের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, ভোলার গ্যাস ব্যবহারে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, সিস্টেম লস ও অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা, গ্যাস বণ্টনের পূর্বঘোষিত সময়সূচি প্রকাশ এবং এসপিএম ও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা।

তিনি বলেন, প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে ওয়ার্কওভারযোগ্য কূপের অগ্রাধিকার তালিকা প্রকাশ এবং ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষ করা যেতে পারে। পাশাপাশি ৩০ দিনের মধ্যে কারিগরি সমস্যায় বন্ধ থাকা কূপগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের দাবি জানান তিনি।

নতুন এফএসআরইউ নিয়ে প্রশ্ন

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন এফএসআরইউ নির্মাণের বিরোধিতা করছে না জামায়াত। তবে শুধু নতুন একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করলেই সংকটের সমাধান হবে না বলে মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, এফএসআরইউ গ্যাস উৎপাদন করে না; এর জন্য এলএনজি আমদানি করতে হয়। এলএনজি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন এবং তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত পাইপলাইনও দরকার। তাই এলএনজি কোথা থেকে আসবে, কী দামে আসবে, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি কী হবে এবং পাইপলাইন কবে প্রস্তুত হবে—এসব বিষয়ও স্পষ্ট করতে হবে।

জামায়াতের এই নেতা দাবি করেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সরকারি ভর্তুকির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

জাতীয় জরুরি জ্বালানি সেল গঠনের দাবি

সংকট মোকাবিলায় সব অংশীজনকে নিয়ে ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি এনার্জি সেল’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াত। পাশাপাশি জরুরি ওয়ার্কওভার ও সংস্কারকাজের অনুমোদন ক্ষমতা নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার মধ্যে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের পরিচালনা পর্ষদকে দেওয়ার বিষয় বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেসলোড প্ল্যান্ট কবে উৎপাদনে আসবে এবং এর ট্যারিফ কত হবে—তা জনগণের কাছে স্পষ্ট করার দাবিও জানান গোলাম পরওয়ার। জরুরি দরপত্র মূল্যায়নের জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা এবং অগ্রাধিকার প্রকল্পে একক তদারকি ব্যবস্থা চালুরও প্রস্তাব দেন তিনি।

তিনি বলেন, সরকার, বিরোধী দল, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী ও স্বাধীন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি যৌথ বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। ৯০ দিন পর জাতীয় সংসদে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

‘সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চাই না’

গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা এই সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চাই না। কারণ জ্বালানি সংকটে সরকার ব্যর্থ হলে শুধু সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটে সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত কার্যকর সমাধান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে।

প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বানের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা আপনার সরকারের কাছেই আছে।’ এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হবে, নাকি আবার নতুন পরিকল্পনা ও কমিটির অপেক্ষায় থাকতে হবে—৯০ দিন পর তার হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরার দাবি জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা‘ছুম, হামিদুর রহমান আযাদ, মোয়াযযম হোসাইন হেলাল, নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, নূরুল ইসলাম বুলবুল, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও নাজিবুর রহমান মোমেনসহ দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad