ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মস্মরণে নির্দিষ্ট কোনো মিলাদ আয়োজনের প্রচলন ছিল না। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলাদুন্নবীর নানা রীতি গড়ে ওঠে। এসব আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে মহানবীর জীবন ও আদর্শ স্মরণ, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানো এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক বন্ধন জোরদার করা।
আরব বিশ্বে ভিন্ন ভিন্ন আয়োজনসৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় মহানবীর জন্মস্মরণকে ঘিরে ধর্মীয় আবহই প্রধান। কাবা শরিফ ও মসজিদে নববিতে মুসল্লিদের উপস্থিতি, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও ইবাদতের মধ্য দিয়ে নবীপ্রেম ও শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটে। অন্যান্য দেশের মতো সেখানে শোভাযাত্রা বা জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জার আয়োজন প্রধান বৈশিষ্ট্য নয়।
মিসরের রাজধানী কায়রোতে এর চিত্র অনেকটাই আলাদা। মাওলিদ উপলক্ষে বিভিন্ন এলাকায় আলোকসজ্জা, ধর্মীয় সংগীত, হামদ-নাত ও সুফি আয়োজনের পাশাপাশি শিশুদের জন্য রঙিন মিষ্টির ঘোড়া ও পুতুলের প্রচলন রয়েছে। পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে মিষ্টি ও খাবার বিতরণের মধ্য দিয়ে উৎসবের সামাজিক দিকটিও ফুটে ওঠে।
মরক্কোয় মিলাদুন্নবীর আয়োজনের সঙ্গে সুফি ঐতিহ্য ও আন্দালুসি সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আন্দালুসি সংগীত, সুফি জিকির, হামদ-নাত এবং ধর্মীয় আলোচনা বিভিন্ন আয়োজনকে সমৃদ্ধ করে। পরিবারগুলো ঐতিহ্যবাহী খাবার, বিশেষ করে কুসকুসের ভোজে অংশ নেয়। ফলে ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন ও আতিথেয়তারও প্রকাশ ঘটে।
লেবানন ও সিরিয়ায় শিশু-কিশোরদের যুক্ত করে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। কোরআন তিলাওয়াত, কুইজ, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, নাত, ছড়া ও কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে মহানবীর জীবন ও আদর্শ তুলে ধরা হয়।
ইয়েমেনের রাজধানী সানায় মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বড় ধরনের জনসমাবেশ ও শোভাযাত্রার আয়োজন দেখা যায়। শহরজুড়ে আলোকসজ্জা করা হয় এবং বিভিন্ন ধরনের খাবারের আয়োজন করা হয়। দরিদ্র মানুষের মধ্যে দান-সদকা ও খাবার বিতরণের মধ্য দিয়ে সামাজিক সহমর্মিতার প্রকাশ ঘটে।
সুদানে মিলাদুন্নবী ধর্মীয় ও লোকজ সংস্কৃতির সমন্বিত একটি আয়োজন হিসেবে দেখা যায়। সুফি জিকির, কবিতা, লোকগান ও নৃত্যের পাশাপাশি রাতভর ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়।
লিবিয়ায় শিশুদের অংশগ্রহণও চোখে পড়ে। রঙিন ফানুস হাতে তারা বিভিন্ন আয়োজনে যুক্ত হয় এবং মহানবীর প্রশংসায় গান পরিবেশন করে। এতে ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে লোকজ সংস্কৃতিরও সংযোগ ঘটে।
তিউনিসিয়ার ঐতিহাসিক কায়রোয়ান শহরে মিলাদ উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন ‘আসিদাতুজ জুকুকু’ প্রস্তুত করা হয়। পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে তা ভাগ করে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও ধর্মীয় আসর অনুষ্ঠিত হয়।
ইরাকের রাজধানী বাগদাদেও মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আয়োজন থাকে। ইমাম আবু হানিফা মসজিদ প্রাঙ্গণে মানুষের সমাগম, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি পালনের ঐতিহ্য রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে তুলনামূলক অনাড়ম্বরভাবে এ উপলক্ষ পালন করা হয়। মসজিদে বিশেষ খুতবা, কোরআন প্রতিযোগিতা, ধর্মীয় আলোচনা ও শিক্ষামূলক আয়োজনের পাশাপাশি গণমাধ্যমে মহানবীর জীবন ও আদর্শ নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়।
দেশ ও অঞ্চলভেদে আয়োজনের ধরন আলাদা হলেও আরব বিশ্বের এসব অনুষ্ঠানের মূল সুর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। খাবার বিতরণ, গণভোজ, দান-সদকা ও পারিবারিক মিলনমেলার মধ্য দিয়ে সামাজিক সংহতি ও মানবিকতার চেতনাও প্রকাশ পায়।
বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে মিলাদুন্নবীবাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে মিলাদুন্নবীর সঙ্গে ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি স্থানীয় ভাষা, সাহিত্য, সুফি ঐতিহ্য ও সামাজিক সংস্কৃতির দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে একই ধর্মীয় উপলক্ষ হলেও অঞ্চলভেদে এর প্রকাশভঙ্গিতে পার্থক্য দেখা যায়।
বাংলাদেশে রবিউল আউয়াল মাসজুড়ে বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে মিলাদ মাহফিল, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও সালাম, হামদ-নাত, ওয়াজ ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কোথাও কোথাও শোভাযাত্রা, আলোকসজ্জা ও পতাকা-ব্যানার প্রদর্শনের আয়োজনও থাকে। বিভিন্ন স্থানে তবারক, মিষ্টি ও খাবার বিতরণের পাশাপাশি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে সহায়তা করা হয়।
বাংলা ভাষায় মহানবীর জীবন, চরিত্র ও আদর্শকে কেন্দ্র করে রচিত নাত, গজল, কবিতা ও ইসলামী সাহিত্যও দেশের মিলাদ সংস্কৃতিকে একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে।
ভারতের দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, মহারাষ্ট্র, বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ, নাত, ধর্মীয় আলোচনা ও মহানবীর জীবন-চরিত্র নিয়ে আলোচনা এসব আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো কোনো অঞ্চলে বড় শোভাযাত্রা হয়, আবার কোথাও পারিবারিক ও ঘরোয়া পরিবেশে দিনটি পালন করা হয়। ভারতের সুফি ঐতিহ্যের প্রভাবেও নাত, কাসিদা ও আধ্যাত্মিক সংগীত মিলাদ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
পাকিস্তানে ঈদে মিলাদুন্নবী ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে পালিত হয়। রবিউল আউয়াল মাসের শুরু থেকেই বিভিন্ন শহর ও জনপদে মসজিদ, মাদ্রাসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি শুরু হয়। লাহোর, করাচি, ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি ও পেশোয়ারসহ বিভিন্ন শহরে মিলাদ মাহফিল, নাত প্রতিযোগিতা, কোরআন তিলাওয়াত, ধর্মীয় আলোচনা ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। অনেক স্থানে মসজিদ, রাস্তা ও ভবন আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। উর্দু, পাঞ্জাবি ও অন্যান্য স্থানীয় ভাষায় রচিত নাত, কাসিদা ও ধর্মীয় কবিতাও এসব আয়োজনের অংশ।
আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে মহানবীর জন্মস্মরণ উপলক্ষে কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ, দোয়া ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আলেমদের আলোচনার পাশাপাশি ধর্মীয় সমাবেশের আয়োজন থাকে। কোথাও পারিবারিক ও মসজিদকেন্দ্রিক আয়োজন প্রাধান্য পায়, আবার কোথাও বড় ধর্মীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। খাবার বিতরণ ও দরিদ্রদের সহায়তার মাধ্যমেও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রকাশ ঘটে।
এশিয়ার অন্যান্য দেশে ভিন্ন মাত্রাদক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সমাজেও মিলাদুন্নবীর আয়োজন স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
ইন্দোনেশিয়ায় মহানবীর জন্মস্মরণ ‘মাওলিদ’ নামে বিভিন্ন অঞ্চলে নানা রীতিতে পালিত হয়। মসজিদ ও ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ, নাত, ধর্মীয় আলোচনা ও মহানবীর জীবনী পাঠের আয়োজন করা হয়। কিছু এলাকায় স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে শোভাযাত্রা, বিশেষ খাবার ও সামষ্টিক ভোজের আয়োজনও দেখা যায়।
মালয়েশিয়ায় এটি ‘মাওলিদুর রাসুল’ নামে পরিচিত। মসজিদ, ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি পর্যায়ে ধর্মীয় আলোচনা, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ, নাত, শোভাযাত্রা এবং সামাজিক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। মহানবীর জীবন ও চরিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা থাকে এসব অনুষ্ঠানে।
ব্রুনেইতে মহানবীর জন্মস্মরণ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় উভয় পরিমণ্ডলেই গুরুত্ব পায়। ধর্মীয় সমাবেশ, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ-নাত, ইসলামি আলোচনা এবং সামাজিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হয়।
মালদ্বীপে মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আলোচনা, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও নাতের মাধ্যমে মহানবীর জীবন ও শিক্ষা স্মরণ করা হয়। তাঁর আদর্শ অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তুরস্কে মহানবীর জন্মস্মরণ ‘মেভলিদ কান্দিলি’ নামে পরিচিত। মসজিদে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া এবং মহানবীর প্রশংসামূলক কবিতা পাঠের প্রচলন রয়েছে। তুর্কি ভাষায় রচিত বিখ্যাত ‘মেভলিদ’ সাহিত্য এ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুফি ও উসমানি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ভিন্ন সংস্কৃতি, অভিন্ন নবীপ্রেমবিশ্বের বিভিন্ন দেশে মিলাদুন্নবীর আয়োজনের ধরন ভিন্ন হলেও এর কেন্দ্রীয় আবেগ প্রায় একই—মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং তাঁর জীবনাদর্শ স্মরণ।
কোথাও নীরব দোয়া ও কোরআন তিলাওয়াত, কোথাও নাত-গজল ও সুফি সংগীত, কোথাও আলোকসজ্জা ও শোভাযাত্রা, আবার কোথাও পারিবারিক মিলন, গণভোজ ও দরিদ্রদের মধ্যে খাবার বিতরণের মাধ্যমে এ উপলক্ষ পালিত হয়। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিকতার চেতনাও প্রকাশ পায়।
মরক্কোর সুফি ঐতিহ্য, মিসরের মাওলিদ সংস্কৃতি, তিউনিসিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার, তুরস্কের মেভলিদ সাহিত্য, ইন্দোনেশিয়ার লোকজ আয়োজন, মালয়েশিয়ার ধর্মীয় সমাবেশ, বাংলাদেশের মিলাদ মাহফিল, ভারতের সুফি ঐতিহ্য, পাকিস্তানের শোভাযাত্রা কিংবা আফগানিস্তানের ধর্মীয় সমাবেশ—প্রতিটি অঞ্চল নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলাদুন্নবীকে যুক্ত করেছে।
ফলে মিলাদুন্নবীকে ঘিরে গড়ে ওঠা এসব বৈচিত্র্যময় আয়োজন শুধু ধর্মীয় স্মরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বহু সমাজে এটি পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মানবিক সহযোগিতারও একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
লেখক: মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
অনুবাদক, বাংলাদেশ দূতাবাস, কাতার

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স