এর মধ্যেই নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ নিয়ে। উদ্যোক্তাদের দাবি, গ্যাস সংকটের কারণে সময়মতো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করতে না পারায় কয়েকটি আন্তর্জাতিক ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে তাদের ক্রয়াদেশ কমিয়ে অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে আরও বেশি ক্রয়াদেশ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এতে দেশের রপ্তানি আয় কমে গিয়ে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার। অর্থাৎ দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশই এসেছে পোশাক খাত থেকে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। এতে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গৃহস্থালি পর্যায়ে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। সরকার ১০ আগস্টের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দিলেও এখনো শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
কোথাও উৎপাদন সক্ষমতা নেমেছে ২০ শতাংশেপোশাকশিল্প উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, উৎপাদন সচল রাখতে সাধারণত কারখানায় ৩ থেকে ৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হয়। ডায়িং কারখানার ক্ষেত্রে ৪ পিএসআইয়ের নিচে চাপ থাকলে উৎপাদন চালানো সম্ভব হয় না। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের একাধিক কারখানায় গ্যাসের চাপ শূন্য থেকে ১ পিএসআইয়ের মধ্যে ছিল।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রায় ৩০০ নিটওয়্যার কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে ১৫ থেকে ২০ লাখ ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা তাদের ক্রয়াদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
নরসিংদী ও ময়মনসিংহেও শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। চালু থাকা অনেক কারখানায়ও উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে। আবার কোথাও স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। ডায়িং ও ওয়াশিং কারখানাগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
অন্য দেশে যাচ্ছে ক্রয়াদেশবিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশের কিছু ক্রয়াদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার তথ্য তারা পেয়েছেন। ক্রেতাদের সঙ্গে তারও কথা হয়েছে। তার নিজের কারখানার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে গেছে বলেও জানান তিনি।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ক্রেতারা ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম বা ভারতে সরিয়ে নেবেন কি না, সেটি তাদের সিদ্ধান্ত। তবে ক্রয়াদেশ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকবেন। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ক্রয়াদেশ কমার পাশাপাশি প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে বাজার হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
তার মতে, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের অসহযোগিতাও বড় কারণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পোশাক ব্যবসায়ী জানান, গ্যাস সংকটে তার কারখানার উৎপাদন প্রায় ১৬ থেকে ১৭ দিন ধরে কার্যত বন্ধ। বিষয়টি জানার পর এক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্রয়াদেশ বাতিল করেছে। বিকল্প হিসেবে শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে উৎপাদনের কাজ করানোর কথা জানিয়েছে তারা। ওই ব্যবসায়ীর দাবি, চলমান সংকটে তার প্রায় ৫০ শতাংশ ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার পথে রয়েছে।
সময়মতো সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ ক্রেতাদেরবাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক ও গালপেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউল আলম মীরু বলেন, ক্রয়াদেশ হারানোর কিছু তথ্য তাদের কাছে আসছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এ কারণে কিছু ক্রয়াদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে।
তিনি জানান, গ্যাস সংকটের কারণে তার নিজের কারখানায় বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চলছে।
রেজাউল আলম মীরু বলেন, এখনই বিপুল পরিমাণ ক্রয়াদেশ চলে যাচ্ছে—এমনটা বলা যাবে না। তবে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে যেসব ক্রয়াদেশের পণ্য পাঠানোর কথা ছিল, সেগুলোর অনেকগুলোর ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ক্রেতাদের মধ্যে অস্বস্তি ও আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।
তার ভাষ্য, এইচঅ্যান্ডএমের মতো বড় ও উচ্চমানের ক্রেতারাও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। গ্রিসের এক ক্রেতার সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের যেসব কারখানার সঙ্গে তারা কাজ করছে, প্রায় সবখানেই উৎপাদন সময়সূচি অনুযায়ী হচ্ছে না এবং পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে।
আকস্মিকভাবে বড় আকারে অর্ডার কমার আশঙ্কা এখনই নয়তবে এখনই বড় আকারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখছেন না বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তিনি বলেন, একটি গার্মেন্টের ক্রয়াদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নিতে হলে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।
তার মতে, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ক্রয়াদেশ এখনই বাতিল বা অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এর পেছনে গ্যাস সংকট ছাড়াও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। ইউরোপে কোনো ক্রেতার বিক্রি কমে গেলে তারা স্বাভাবিকভাবেই ক্রয়াদেশ কমাতে পারেন। আবার বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো ক্রেতা ক্রয়াদেশ বাতিলও করতে পারেন। ফলে কিছু ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার পাশাপাশি কিছু পণ্য অবিক্রীত বা আটকে থাকার আশঙ্কাও রয়েছে।
গড়ে ৩০ শতাংশ কমেছে উৎপাদন সক্ষমতাবিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার বিষয়টি এখনো কেউ তাকে জানাননি। তবে শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে কোনো কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোনো কারখানা ৭০ শতাংশ, কোনোটি ৭৫ শতাংশ, আবার কোনোটি ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। গড়ে পোশাকশিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, গ্যাস সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ারও তেমন কোনো উপায় নেই। যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। কারণ সংকট যত দীর্ঘ হবে, শিল্প ও রপ্তানি খাতে এর প্রভাব ততই বাড়বে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল মনে করেন, সরকার আন্তরিক হলে গ্যাস সংকট আরও আগেই সমাধান করা সম্ভব হতো। তিনি বলেন, সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে; এখন পর্যন্ত তারা জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি।
এর আগে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছিলেন, গ্যাস সংকটের কারণে টেক্সটাইল খাতের প্রায় ৮০ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে ক্রয়াদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের রপ্তানি আয় ও সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক