বেপরোয়া ডাম্প ট্রাকে বিপর্যস্ত রাজশাহী-চাঁপাই মহাসড়ক

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৫ দুপুর
  • ২৫৮৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কসহ আঞ্চলিক সড়কগুলোতে বালু ও মাটিবাহী ডাম্প ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। অতিরিক্ত বালু বোঝাই, দ্রুতগতিতে চলাচল, খোলা অবস্থায় বালু পরিবহন এবং অদক্ষ চালকের কারণে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারী ও যানবাহনের চালকেরা। উড়ন্ত বালু-ধুলায় দৃষ্টিশক্তি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দূষিত হচ্ছে পরিবেশ ও বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পদ্মা নদীর বিভিন্ন বালুঘাট থেকে উত্তোলন করা বালু শত শত ডাম্প ট্রাকে করে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নেওয়া হচ্ছে। এসব ট্রাকের অনেকগুলো ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বালু বহন করে। এতে একদিকে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে ভারী যান চলাচলে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ও সংস্কার করা সড়ক।

ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বালু

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোদাগাড়ীর পদ্মার বিভিন্ন বালুঘাট থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু ও মাটি পরিবহন করা হয়। একেকটি ডাম্প ট্রাকে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ টন পর্যন্ত বালু ও মাটি বহন করা হচ্ছে। অথচ সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোর সর্বোচ্চ ভারবহন ক্ষমতা ১৫ থেকে ২০ টনের মধ্যে।

গোদাগাড়ীর প্রেমতলী ও ফুলতলা বালুঘাট থেকে উত্তোলন করা বালু অতিরিক্ত বোঝাই ডাম্প ট্রাকে করে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক, বিজয়নগর-উজানপাড়া ভিতরপাশ সড়কসহ বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অতিরিক্ত ভারী যান চলাচলের কারণে সড়কগুলো দ্রুত ভেঙে পড়ছে।

ধুলায় দুর্ভোগ, বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা

সরেজমিনে দেখা গেছে, গোদাগাড়ীর সেখেড়পাড়া, ভাটোপাড়া, ফুলতলা, সারেংপুর, সুলতানগঞ্জ ও গাঙ্গবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ডাম্প ট্রাক, ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র পর্দা দিয়ে বালু ঢেকে রাখা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে চলন্ত গাড়ি থেকে বালু উড়ে পথচারী ও যানবাহনের চালকদের চোখে-মুখে পড়ছে।

সড়কের পাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও জনবসতি থাকায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বালুর ধুলা, গাড়ির হর্ন ও কালো ধোঁয়ায় পরিবেশও দূষিত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ধুলাবালুর কারণে অনেকে শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যায় ভুগছেন।

সেখেড়পাড়ার বাসিন্দা আল-আমিন বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে শত শত ডাম্প ট্রাক চলাচল করে। চালকেরা নিয়মকানুন না মেনে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

নাচোলগামী মোটরসাইকেল আরোহী শরীফ বলেন, ডাম্প ট্রাক চলার সময় চোখ-মুখ ধুলায় ভরে যায়। একদিকে বাতাস, অন্যদিকে দ্রুতগতির ভারী যান—সব মিলিয়ে সড়কে চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

অটোচালক দুলাল বলেন, বালুবাহী গাড়ির কারণে সড়কে যান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। উড়ে আসা বালু যাত্রী ও চালকদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করছে।

ঘরেও ঢুকছে বালুর ধুলা

ভাটোপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তোফাজ্জল বলেন, ডাম্প ট্রাক চলাচলের সময় অনবরত ধুলাবালি উড়ে চারপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। বালু ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ায় দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হয়। বাইরে কাপড় শুকানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়েও দুর্ঘটনার আশঙ্কায় স্বস্তিতে থাকা যায় না।

গোদাগাড়ী উপজেলা নাগরিক স্বার্থ রক্ষা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালাউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, বেপরোয়া ডাম্প ট্রাকে এভাবে বালু পরিবহন করা হলে মানুষের দুর্ভোগ বাড়তেই থাকবে। মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

সড়ক ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনা

রাজশাহী বিআরটিএ সূত্র জানায়, বালুবাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচল সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বিশেষ করে ডাম্প ট্রাকের দুর্ঘটনার প্রবণতা বেশি বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান বলেন, বালুবাহী ট্রাকের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন সড়কে বিপুলসংখ্যক বালু ও মাটিবাহী ভারী যান চলাচল করে। রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশে থাকা বিভিন্ন ইটভাটায়ও এসব বালু ও মাটি সরবরাহ করা হয়।

তিনি বলেন, বালু ও মাটি পরিবহনের সময় অনেক ক্ষেত্রে তা ঢেকে রাখা হয় না। ফলে ট্রাক থেকে বালু ও কাদামাটি সড়কে পড়ে পিচ্ছিল হয়ে যায়। এতে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা বাড়ছে এবং সংস্কার করা সড়ক দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।

ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পুলিশের

গোদাগাড়ী ট্রাফিক সার্জেন্ট আমির হামজা বলেন, সম্প্রতি ডাম্প ট্রাকের দৌরাত্ম্য কিছুটা বেড়েছে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন বা বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে নিয়মিত মামলা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, খোলা অবস্থায় বালু পরিবহন আইনত দণ্ডনীয়। এভাবে বালু পরিবহন করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ডাম্প ট্রাকের চালক ও মালিকদের ট্রাফিক আইন ও নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু মামলা দিয়ে নয়, অতিরিক্ত বালু বোঝাই ও বেপরোয়া ডাম্প ট্রাকের চলাচল বন্ধে নিয়মিত অভিযান, চালকদের দক্ষতা যাচাই এবং কার্যকর ট্রাফিক নজরদারি জোরদার করতে হবে।

তথ্যসূত্র: রাজশাহী বিআরটিএ; সড়ক ও জনপথ বিভাগ; গোদাগাড়ী ট্রাফিক বিভাগ।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad