আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা বিভিন্ন গতির ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তবে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন সম্পর্কে সব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
হুথিদের অস্ত্রভান্ডারে ইরানি প্রযুক্তির প্রভাব২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বেড়েছে বলে বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের হাতে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের ড্রোন রয়েছে।
প্রতিবেদনে প্যালেস্টাইন-২ ও তুফান ক্ষেপণাস্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্যালেস্টাইন-২-এর পাল্লা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার বলে দাবি করা হয়। তুফান ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা আনুমানিক ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ কিলোমিটার বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এসব অস্ত্রের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও সক্ষমতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত।
কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধবিদ্যাবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ ফেলো নওয়াফ ওবায়েদের মতে, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারে ইরানি প্রযুক্তির প্রভাব রয়েছে; কিছু ক্ষেত্রে চীনা প্রযুক্তির প্রভাবও থাকতে পারে। তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, হুথিদের নিজস্ব প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রমাণ তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং তাদের উৎপাদন সক্ষমতা মূলত অপেক্ষাকৃত কম উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সৌদির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কোথায়সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষায় প্যাট্রিয়ট ও টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ব্যবস্থার মতো উন্নত প্রযুক্তি রয়েছে। এসব ব্যবস্থা বিভিন্ন উচ্চতা ও দূরত্বে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য তৈরি। তবে কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই সব ধরনের হামলা শতভাগ ঠেকানোর নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
নওয়াফ ওবায়েদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ড ও দীর্ঘ সীমান্তের কারণে সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সমানভাবে সুরক্ষিত রাখা কঠিন। একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন একসঙ্গে বিভিন্ন দিক থেকে ছোড়া হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়তে পারে। ধারাবাহিকভাবে বহু হামলা প্রতিহত করার পরও কোনো একটি অস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকে।
নিরাপত্তানীতি ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক উলফগাং পুস্তাইয়ের মতে, সৌদি আরবের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মূলত ইরান থেকে আসা হুমকি মোকাবিলায় গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল। তবে ইয়েমেনের দিক থেকে হামলার ধরন ও মাত্রা পরিবর্তিত হওয়ায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কিছু অংশ নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগহুথিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও পুনরায় সরবরাহ নিশ্চিত করা। প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো ব্যবস্থায় প্রতিটি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার ব্যয়বহুল। দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক হামলা মোকাবিলা করতে হলে পর্যাপ্ত মজুত, দ্রুত পুনঃসরবরাহ এবং কার্যকর লক্ষ্য শনাক্তকরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতার কারণে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। গত মাসে হুথিদের হামলা মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষাসহ অন্যান্য সহায়তার জন্য সৌদি আরব কয়েকটি বন্ধুদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
হুথিদের সামরিক সক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছেসৌদি আরবের তুলনায় সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে তাদের অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা এবং দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিক হামলা চালানোর সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই।
নওয়াফ ওবায়েদের মতে, সৌদি বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ও ড্রোন উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে। এসব স্থাপনায় হামলা হলে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে উলফগাং পুস্তাইয়ের ধারণা, হুথিদের হাতে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত হয়ে এলে একযোগে বড় আকারের হামলা চালানো কঠিন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কম সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে বিচ্ছিন্ন হামলা চালিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যাহত করার মতো কৌশল তারা নিতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বাড়তি চাপসৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ এবং জি-২০ জোটের সদস্য। ফলে দেশটির বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, হুথিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের চ্যালেঞ্জ শুধু উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। এর সঙ্গে জড়িত ভূখণ্ডের ব্যাপ্তি, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, গোয়েন্দা তথ্য, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং একাধিক ধরনের আকাশপথের হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, কিংস কলেজ লন্ডনের জ্যেষ্ঠ ফেলো নওয়াফ ওবায়েদ এবং নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক উলফগাং পুস্তাইয়ের বক্তব্য।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক