বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার মধ্য দিয়ে তেহরান প্রমাণ করেছে যে, প্রয়োজন হলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুটে তারা কার্যকরভাবে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো সমঝোতা হলেও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই কৌশলগত প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি তেহরানের জন্য এক ধরনের নতুন ‘জ্বালানি কূটনীতি’ বা ‘এনার্জি লিভারেজ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন শিল্পখাতের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউ বলেন, ইরান দেখিয়েছে যে, প্রবল সামরিক চাপের মধ্যেও তারা হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টি বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। তার মতে, এই সক্ষমতা ভবিষ্যতেও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর উদ্যোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান সম্প্রতি হরমুজ প্রণালির ট্রানজিট কার্যক্রম তদারকির জন্য ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি (পিজিএসএ)’ নামে একটি নতুন কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে। এই ব্যবস্থার আওতায় জাহাজের তথ্য যাচাই এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে ট্রানজিট ফি বা টোল আদায়ের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এই কর্তৃপক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে এ ধরনের লেনদেন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে টোল প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
তেলের দামে বাড়তি চাপের আশঙ্কা
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
অন্যদিকে, জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রাইস্ট্যাড এনার্জির ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোর্হে লিওনের মতে, ভবিষ্যতে তেলের দামে প্রতি ব্যারেলে ১০ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ‘ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি প্রিমিয়াম’ যোগ হতে পারে।
বিকল্প রুট তৈরির চেষ্টা
হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে ইতোমধ্যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পাইপলাইন ব্যবস্থার সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হওয়ায় স্বল্প সময়ে হরমুজের কার্যকর বিকল্প তৈরি করা কঠিন।
বিশেষ করে কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোর জন্য বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরি করা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও জটিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন বাস্তবতা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তবে বিশ্লেষকদের অভিমত, আগামী কয়েক দশকেও মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য থাকবে। আর সে কারণেই হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও এর ওপর ইরানের প্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে থাকবে।
সূত্র: সিএনএন অবলম্বনে

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক